রিপা, আপনার এই দীর্ঘ যাত্রার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আপনার বর্তমান অনুভূতি কেমন?
রিপা সাধু: আদাব আপু। সত্যি বলতে, অনুভূতিটা মিশ্র। একদিকে স্নাতক শেষ হতে যাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে এই চার বছরের দীর্ঘ লড়াইয়ের স্মৃতিগুলো বারবার মনে পড়ছে। যে পরিবেশ থেকে আমি এসেছি, সেখান থেকে এই পর্যায়ে আসাটা এক সময় অবিশ্বাস্য মনে হতো। আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন কৃতজ্ঞতায় মন ভরে যায়।
আপনি এমন একটি বিষয়ে পড়ছেন যা সাধারণত বেশ কঠিন এবং তাত্ত্বিক।' পিপিই' বিভাগটি বেছে নেওয়ার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ ছিল কি?
রিপা সাধু: আমি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে বাণিজ্য বিভাগে (কমার্স) পড়েছি। গণিতের প্রতি আমার আগে থেকেই আগ্রহ ছিল। তবে যখন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে এলাম, তখন দেখলাম এখানে কমার্সের সরাসরি কোনো সাবজেক্ট নেই। আমি জানতাম আমাকে নতুন কিছু বেছে নিতে হবে। আমি দেখলাম, রাজনীতি আমাকে টানে, দর্শনের গভীরে প্রবেশ করতে ইচ্ছে করে। পিপিই এমন একটি বিভাগ যেখানে দর্শন, রাজনীতি এবং অর্থনীতি-তিনটি বিষয়ই সমন্বিতভাবে শেখানো হয়। আমি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজ ও রাষ্ট্রকে এই তিনটি ভিন্ন লেন্স দিয়ে দেখতে চেয়েছি।
আমরা জানি আপনার বেড়ে ওঠা চা বাগানে। আপনার শৈশবের পড়াশোনা এবং সেই পরিবেশের কথা যদি পাঠকদের জন্য একটু বলতেন।
রিপা সাধু: আমার পড়াশোনার হাতেখড়ি চুনারুঘাটের চা বাগানে। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আমাদের বাগানের হাসমত সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পড়েছি। এরপর তাহের শামসুন্নাহার উচ্চ বিদ্যালয়, যা চাঁদপুর বাগানে অবস্থিত। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেছি চুনারুঘাট সরকারি কলেজ থেকে। তখন যাতায়াতের তেমন সমস্যা ছিল না। হাইস্কুল পর্যন্ত হেঁটে যেতাম, কলেজে যাওয়ার জন্য কিছুটা পথ রিকশা বা গাড়িতে যেতে হতো। কিন্তু অভাবটা ছিল তথ্যের এবং আর্থিক সংগতির।
আপনার পরিবারের আর্থিক অবস্থা তখন কেমন ছিল? সেই সময় কি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিল?
রিপা সাধু: ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত তো আসলে টাকা লাগে না। হাইস্কুলেও বাবার চাকরি ছিল বলে খুব একটা সমস্যা হয়নি। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটল আমি যখন কলেজে উঠি। মাত্র দুই-তিন মাস যাওয়ার পরেই বাবার বয়স হয়ে যাওয়ায় তাঁর চাকরিটা চলে যায়। আমাদের পুরো পরিবার এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল। যেহেতু আমি কমার্সের স্টুডেন্ট ছিলাম, অ্যাকাউন্টিং, ফিন্যান্স, আইসিটি আর ইংলিশ-এই বিষয়গুলো প্রাইভেট পড়া ছাড়া উপায় ছিল না। কিন্তু শিক্ষকের ফি দেওয়ার মতো টাকা তখন আমাদের ছিল না।
সেই সংকট থেকে আপনি বের হলেন কীভাবে?
রিপা সাধু: আমার শিক্ষকদের অবদান আমি কোনো দিন ভুলব না। আমি নিয়মিত কলেজে যেতাম, ভালো রেজাল্ট করতাম এবং ক্লাসে খুব মনোযোগী ছিলাম। শিক্ষকেরা আমাকে স্নেহ করতেন। যখন দেখলাম আর ফি দিতে পারছি না, তখন ভয়ে ভয়ে শিক্ষকদের সব খুলে বললাম। তাঁরা শুধু একটি কথাই বলেছিলেন, ‘‘রিপা, তোমার টাকা দিতে হবে না, তুমি শুধু প্রতিদিন ক্লাসে আসবে।” তাঁদের এই মহানুভবতার কারণেই আমি এইচএসসি পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছি।
আপনি তো পাবলিকে পড়ার স্বপ্ন দেখতেন। তাহলে এইউডব্লিউ সম্পর্কে জানলেন কীভাবে? সেখানে ভর্তি হওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
রিপা সাধু: সত্যি বলতে, দশম শ্রেণি পর্যন্ত আমি জানতামই না 'বিশ্ববিদ্যালয়' আসলে কী! আমি ভাবতাম বড় হয়ে বৃন্দাবন সরকারি কলেজে অ্যাকাউন্টিং নিয়ে পড়ব। এরপর কলেজে ওঠার পর আমাদের বাগানে 'উৎস' নামের একটি সংগঠনের দাদা-দিদিদের মাধ্যমে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ধারণা পাই। এরপর যখন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের ভর্তি পরীক্ষার কথা জানলাম, আমাদের বাগানের কিছু দাদা এবং দিদি আমাকে প্রস্তুতির জন্য খুব সাহায্য করলেন। শ্রীমঙ্গলে গিয়ে যখন ফরম পূরণ করি এবং কোচিং করি, তখন আমার আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষা শেষে যখন সুযোগ পেলাম, তখন মনে হলো জীবনের এক নতুন দিগন্ত খুলে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা কেমন ছিল? বিশেষ করে ইংরেজির চাপ এবং সাংস্কৃতিক ভিন্নতা-এগুলো কীভাবে সামলেছেন?
রিপা সাধু: এটা ছিল এক বিরাট যুদ্ধ। আমার প্রথম সেমিস্টার ছিল অনলাইনে, তাই বাড়িতে বসে খুব একটা ভয় লাগেনি। কিন্তু যখন সশরীরে ক্যাম্পাসে এলাম, তখন বুক কাঁপতে শুরু করল। আমার রুমমেটরা বাংলাদেশি হওয়ায় কিছুটা রক্ষা পেলাম, কিন্তু ক্লাসে গিয়ে দেখি সব বিদেশি ফ্যাকাল্টি। সবাই অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলছে। আমি ভাবতাম, আমি যদি কিছু বলতে গিয়ে ভুল করি, গ্রামারে ভুল হয়, তবে সবাই হাসবে কি না। আমি অনেক ওভার থিঙ্কিং করতাম। কিন্তু পরে যখন দেখলাম আমার বিদেশি বন্ধুরা ভুল ইংরেজি বলেও কত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলছে, তখন আমার জড়তা ভাঙতে শুরু করল। আমি বুঝলাম, ভাষা কেবল প্রকাশের মাধ্যম, ভুল হওয়াটা বড় অপরাধ নয়।
আপনি একবার বলেছিলেন যে দুশ্চিন্তায় আপনি খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হয়েছিলেন। সেই কঠিন সময়টার কথা কি একটু বিস্তারিত বলা যায়?
রিপা সাধু: হ্যাঁ, সেই সময়টা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আতঙ্কের। প্রি-ইউজি (Pre-UG) লেভেলে আমাদের পলিসি ছিল যে 'পাসওয়ার্ড এক্সাম' নামক একটি বিশেষ পরীক্ষায় পাস করতেই হবে, নয়তো ইউনিভার্সিটি থেকে বের করে দেওয়া হবে। আমার সিজিপিএ ভালো ছিল, আমি কোনো দিন ওয়ার্নিং পাইনি, কিন্তু তবুও আমার মধ্যে প্রচণ্ড ভয় ঢুকে গিয়েছিল। আমি সারা রাত কাঁদতাম, ঘুম হতো না। আমি ভাবতাম যদি বের করে দেয় তবে আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। আমি আমার মেজো ভাইকে কল করে বলতাম যে আমি বোধয় পারব না। আমি তখন ব্যাকআপ হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হয়েছিলাম। আজ যখন ভাবি, তখন নিজের ওপর হাসি পায় যে আমার আত্মবিশ্বাস কতটা কম ছিল।
আপনার পরিবার, বিশেষ করে আপনার ভাইয়েরা আপনাকে কীভাবে উৎসাহিত করেছিলেন?
রিপা সাধু: আমার নিজের কোনো ভাই নেই, আমরা তিন বোন। কিন্তু আমার মামার দুই ছেলে-সন্দীপ অধিকারী ও তার ছোট ভাই-আমাকে কখনো বুঝতে দেননি যে আমার আপন ভাই নেই। আমার মেজো ভাই শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, "রিপা, তুই শুধু তোর বেস্টটা দেওয়ার চেষ্টা কর। আমি আছি তো। জীবন শেষ হয়ে যাবে না। " তাঁদের সাপোর্ট আর প্রথম আলো ট্রাস্টের 'অদ্বিতীয়া' বৃত্তির সহায়তা না থাকলে আজ আমি এখানে থাকতাম না।
আপনার বাবা-মা তো নিশ্চয়ই এখন খুব খুশি। তাঁদের কোনো বিশেষ স্মৃতি কি মনে পড়ছে?
রিপা সাধু: আমার বাবা খুব চাপা স্বভাবের মানুষ। মুখে কখনো বলেন না যে তিনি আমাকে নিয়ে কতটা গর্বিত। কিন্তু যখন প্রথম আলোতে আমার খবর এল, বাবা সেই পত্রিকা নিয়ে পুরো চায়ের দোকান আর পাড়া-প্রতিবেশীকে দেখিয়ে বেড়িয়েছেন। মা আমার সেই ছবির অংশটুকু কেটে সুন্দর করে ফাইলে গুছিয়ে রেখেছেন। যখনই বাড়ি যাই, মা সেটা দেখিয়ে বলেন, "এটা দেখলেই আমার প্রাণটা জুড়িয়ে যায়।" মা-বাবার এই চোখের ভাষাই আমার সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়।
আপনি এখন স্নাতক শেষ করছেন। আপনার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিয়ে কিছু বলুন।
রিপা সাধু: আমি এখন পিপিই নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হলেও আমার মূল লক্ষ্য হলো মাস্টার্স শেষ করা এবং এরপর বিসিএস ক্যাডার হওয়া। আমি সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করতে চাই। বিশেষ করে যারা আমার মতো চা বাগান বা পিছিয়ে পড়া এলাকা থেকে আসে, তাদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে চাই।
আমাদের অদ্বিতীয়াদের জন্য আপনার বিশেষ কোনো বার্তা আছে কি? যারা প্রতিকূলতার কারণে স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়?
রিপা সাধু: আমি শুধু বলব, ভয় পেয়ো না। পথ যত কঠিনই হোক না কেন, যদি তুমি তোমার কাজে সৎ থাকো এবং চেষ্টা চালিয়ে যাও, তবে সাহায্য করার মতো মানুষ তুমি খুঁজে পাবেই। আত্মবিশ্বাসটাই আসল। আমি যদি চা-বাগান থেকে আজ এই পর্যায়ে আসতে পারি, তবে তোমরাও পারবে।
আপনার এই অনুপ্রেরণামূলক গল্প আমাদের সবার জন্য এক বড় শিক্ষা। আপনার আগামীর প্রতিটি পদক্ষেপ সফল হোক, আপনি বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করুন, এই কামনাই করি। আমাদের সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
রিপা সাধু: আপনাকে এবং প্রথম আলো ট্রাস্টকেও অনেক ধন্যবাদ। আদাব।