মাদকাসক্ত হলে বিয়ে দেওয়া হয়, বিয়ে কোন চিকিৎসা নয়
একজন ব্যক্তি কী কী কারণে মাদকাসক্ত হতে পারে। মাদক গ্রহণ করতে করতে অভ্যাসে পরিনত হয় । মাদকের ওপর শরীর ও মন নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। একটি কারণে নয় বরং অনেকগুলো কারণে মাদক গ্রহণ করে থাকে। কৌতুহলে, বন্ধুদের চাপে পড়ে আবার মাদক সহজলভ্য এটা একটা কারণ । মাদক সম্পর্কে ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি। গল্প-উপন্যাসে দেখা যায় প্রেমে ব্যর্থ হলে বা পরীক্ষায় ফেল করলে মুক্তির পথ হিসেবে কেউ মাদক গ্রহণ করে। এক বা একাধিক কারণে মাদক ব্যক্তি গ্রহণ করতে পারেন। গত ১০ মে সোমবার প্রথম আলো ট্রাস্টের মাদকবিরোধী অনলাইন পরামর্শ সভায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহমেদ হেলাল এ কথা বলেন। বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে আধা ঘণ্টা প্রথম আলোর ফেসবুক পেজে মাদকবিরোধী অনলাইন পরামর্শ সহায়তা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়কারী মাহবুবা সুলতানা। অনলাইনে মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভার এটি ছিল ১৯তম আয়োজন।
ডা. আহমেদ হেলাল আরও বলেন, মাদকাসক্ত একটি রোগ। এর বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা রয়েছে। মোটা দাগে বলা যায় মাদকের সরবরাহ (সাপ্লাই)বন্ধ করা, মাদকের চাহিদা হ্রাস করা, বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের ইতিবাচক ভুমিকা ব্যাক্তিকে মাদক থেকে দূরে রাখতে পারে। মাদকের সরবরাহ বন্ধ করা এটা রাস্ট্রের কাজ । মাদকের চাহিদা হ্রাস করার ক্ষেত্রে ব্যাক্তির না বলার শক্তি থাকতে হবে। সামনে মাদক থাকলেও তা গ্রহণ না করার নৈতিক শক্তি কিংবা সামাজিক দক্ষতা থাকতে হবে।
পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান মাদক গ্রহণ করলে মা-বাবা বুঝতে পারে না, অনেক সময় লুকিয়ে রাখেন সন্তানের মাদক গ্রহণের কথা। সন্তান বা প্রিয়জন মাদক গ্রহণ করছেন কিনা, শুরু থেকেই বুঝতে পারলে চিকিৎসা করা সহজ হয়। সিগারেট কিন্তু মাদকের প্রবেশদ্বার। ধূমপানে আসক্ত হলেও, মাদকাসক্ত হতে পারে।
প্রশ্ন ছিল, সামনে মাদক থাকলেও গ্রহন করবে না । এরকম কোনো শর্টকাট উপায় আছে কিনা। এর জবাবে ডা. আহমেদ হেলাল বলেন, ব্যক্তিত্বের বিকাশ যদি দুর্বল থাকে, পছন্দ-অপছন্দকে শিশুকাল থেকে প্রকাশ করতে না পারলে, শৈশবে ছোট ছোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। তাহলে বড় হয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ধরা যাক একটি শিশু ফার্মের মুরগির ডিমের অমলেট খাবে, নাকি দেশি মুরগির ডিমের অমলেট খাবে এই সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হবে। মস্তিষ্কের যে সার্কিটটি কাজ করে বড় হয়ে ওই ব্যাক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে, যুদ্ধ করবে, না কি আত্মসমর্পণ করবে, ওখানেও মস্তিষ্কের ওই সার্কিটটি একই কাজ করে।
মস্তিষ্কের সার্কিট যদি সচল না থাকে তাহলে বন্ধুরা বলবে চলো মাদক খাই। মাদক গ্রহণকে না বলার মতো সক্ষমতা থাকতে হবে। পছন্দ-অপছন্দ করার সক্ষমতা থাকা চাই। ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুশীলন করতে হবে।
মাদকের পুনরাসক্তি প্রসঙ্গে আহমেদ হেলাল বলেন, যুক্তরাস্ট্রের একটি গবেষণায় দেখা যায় শতকরা ৫০ ভাগ রোগী মাদকে পুনরাসক্তি হতে পারে। একবার বা একাধিকবার রোগী মাদকে পুনরাসক্তি হতে পারে। এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। তা হলো
১.সময়: যেই সময়ে সে মাদক গ্রহণ করত সেই সময়ে সতর্ক থাকতে হবে।
২.স্থান : যে জায়গায় মাদক গ্রহণ করত সেই জায়গা এড়িয়ে চলা।
৩.ব্যাক্তি: যাদের সঙ্গে বসে মাদক গ্রহণ করত তাদের এড়িয়ে চলা।
এ ক্ষেত্রে পরিবার ও বন্ধুর ভূমিকা বেশি। পরিবার তাকে অহেতুক সন্দেহ না করে সহানুভূতি দেখাবে। মাদকাসক্ত ব্যাক্তির পাশে থাকতে হবে, কাজের জায়গা ফিরে যেতে হবে, দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে ।
প্রশ্ন ছিল হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করা সম্ভব কিনা? এর জবাবে আহমেদ হেলাল বলেন, হাসপাতালে ও বাড়ি রেখে উভয় জায়গাতে রেখে চিকিৎসা হয়। একেক দেশে একেক রকম যেমন, ব্রাজিলে আমি দেখেছি বাসায় রেখে চিকিৎসা, পরিবারের ভেতরে রেখে চিকিৎসা করা হচ্ছে। ব্রাজিলে মাদকাসক্তির হার বেশি । জাপানের হিরোশিমায় দেখেছি সকালে মাদকাসক্তরা বাসে করে কাজে যাচ্ছে, দেখেছি মাদকাসক্তরা সারাদিন কাজ করছে। বিকেলে কাজ শেষে ঘরে ফিরছে পরিবারে কাছে। কিন্তু আমাদের দেশে দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসা হাসপাতালে রেখেই করা হয়।
আহমেদ হেলাল আরও বলেন, আমাদের দেশে মাদকাসক্ত হলে কতগুলো ভুল ধারনা আছে তা হলো, মাদকাসক্ত হলে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়, বিয়ে কোন চিকিৎসা নয়। মাদকাসক্ত হলে তাকে বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়, বিদেশে গিয়ে বরং নতুন কোনো মাদকে আসক্ত হতে পারে। মাদকাসক্ত ব্যাক্তিকে বেঁধে রেখে নিযার্তন করা হয়, এটাও ঠিক নয়। মাদক নিরাময়ের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা রয়েছে। মাদক দূর করার জন্য মাদকাসক্ত ব্যাক্তিকে নিবিড় পর্যবেক্ষনে রাখতে হবে। প্রত্যাহারজনিত উপসর্গ হতে পারে। পুনরাসক্তি যেন না হয় এজন্য বন্ধু ওপরিবারের ভুমিকা রয়েছে সবচেয়ে বেশি।