অদম্য মেধাবী–২০২৫—১
দারিদ্র্যের বাধা পেরিয়ে সাফল্যের দেখা
অভাবের সংসারে একরকম যুদ্ধ করে পড়ালেখা করেছে সুব্রত কুমার কুণ্ডু। অসুস্থ শরীর নিয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে এসে মাকে বলেছিল, ‘আমি ফেল করব, মা।’ কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, সে জিপিএ-৫ পেয়েছে!
সুব্রতর এমন সাফল্য পরিবারে খুশির আমেজ নিয়ে এলেও দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার খরচ নিয়ে। ফরিদপুরের সালথা উপজেলার সুব্রত কুমারের মতোই জিপিএ-৫ পেয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছে যশোরের আনিকা রহমান, সুনামগঞ্জের অলিদ হাসান ও নীলফামারীর তানজিনা আক্তার। এই অদম্য মেধাবীরা উচ্চশিক্ষা নিয়ে দরিদ্র পরিবারে হাসি ফোটাতে চায়।
স্কুলে একমাত্র জিপিএ-৫ সুব্রতর
সুব্রত কুমার সালথা উপজেলার বল্লভদী ইউনিয়নের বিষ্ণুদি গ্রামের সুধীর কুণ্ডু ও লিপিকা রানী কুণ্ডু দম্পতির ছেলে। সে স্থানীয় ফুলবাড়িয়া উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয়। বিদ্যালয়ে পাসের হার ছিল মাত্র ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এর মধ্যে সুব্রতই একমাত্র জিপিএ-৫ পেয়েছে। পুরো উপজেলায় জিপিএ-৫ পাওয়া চারজনের একজন সে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, এসএসসি পরীক্ষার ঠিক আগে জ্বরে আক্রান্ত হয় সুব্রত। সর্দিকাশিতে ভুগে ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু মায়ের হাত ধরে, বাবার সাহসী কথায় ভরসা রেখে পরীক্ষায় অংশ নেয়। তার এ সাফল্যের গল্প ওই ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।
সুব্রতর বাবা ক্ষুদ্র মুদি ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। সুধীর কুণ্ডু বলেন, ‘এত দিন খেয়ে না খেয়ে ওর পড়ার খরচ চালিয়েছি। এখন কলেজে ভর্তি হবে। এ খরচ কীভাবে আসবে!’ সুব্রত জানায়, তার স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। সে দেশসেবা করতে চায়।
ফুলবাড়িয়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে এম মহিউদ্দিন বলেন, ‘নবম শ্রেণিতে ওঠার পর আমি বলেছিলাম বিজ্ঞান নিতে, কিন্তু সুব্রত রাজি হয়নি। সে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে না। তার ইচ্ছা প্রশাসনে যাওয়া—ইউএনও, ডিসি হওয়া। সুব্রত যেমন মেধাবী ছেলে, লেগে থাকলে ওর স্বপ্ন পূরণ হবে।’
‘বাবা বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন’
‘আমি প্রতিদিন ১০ কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যাওয়া-আসা করেছি। এতে আমার কষ্ট হলেও আমার মায়ের কষ্টটা অনেক বেশি। আজকে আমার বাবা বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন। এখন আমি একটা ভালো কলেজে ভর্তি হতে চাই। আরও ভালো ফল করে চিকিৎসক হতে চাই।’
জেলা শহরের সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া তানজিনা আক্তার। সে জেলা সদরের ইটাখোলা ইউনিয়নের উত্তর কানিয়াল খাতা আদর্শ ফকিরপাড়া গ্রামে ছোট ভাই, মাসহ নানার বাড়িতে থাকে। সেখান থেকেই পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে স্কুলে যাতায়াত করত।
তানজিনার মা চায়না বেগম জানান, তাঁর স্বামী মিলন হক রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। সাত বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। স্বামীর কোনো সম্পদ না থাকায় ছোট দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেন। বাবার দেওয়া একটি ঘরে কোনোমতে বসবাস করছেন। একটি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে সন্তানদের ভরণপোষণ করছেন। ছোট ছেলে তানজির ইসলাম ষষ্ট শ্রেণিতে পড়ে। ভালো ফল করা মেয়ে চিকিৎসক হতে চাইলেও তাকে পড়ানোর সামর্থ্য নেই উল্লেখ করে চায়না বেগম বলেন, ‘টাকার অভাবে তাদের একটু ভালোমন্দ খাওয়াতে পারি না।’
তানজিনার কলেজের অধ্যক্ষ মো. সিদ্দিক সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়েটা অনেক ভদ্র ও মেধাবী। তাকে একটু সহযোগিতা দেওয়া গেলে সে তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে বলে আশা করি।’
কৃষিশ্রমিকের কাজ করে জিপিএ-৫
অলিদ হাসানের বাবা নেই। নেই নিজের বসতঘর। তিন ভাইবোনের লেখাপড়া আর সংসার খরচ, সবই চালাতে হয় অন্যের জমিতে কৃষিশ্রমিকের কাজ ও টিউশনি করে। এত টানাপোড়েনের মধ্যে থেকেও এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
অলিদের বাড়ি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের সূর্যেরগাঁও গ্রামে। সে তাহিরপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চার বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর মা, এক ভাই ও এক বোনকে নিয়ে অলিদদের সংসার। মা মেহের আক্তারও অসুস্থ। অর্থাভাবে বসতভিটায় থাকা ঘর সংস্কার করতে না পারায় এখন পাশের ঠাকুরহাটি গ্রামে একটি ছোট্ট ঘরে ভাড়া থাকে পরিবারটি। ছোট বোন তাসফিয়া আক্তার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।
অলিদের বড় ভাই নাহিদ হাসান সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে গণিতে সম্মান পড়েছেন। তিনি জানান, অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া ও সংসার চালাতে হচ্ছে। ছোট ভাই অলিদ গ্রামে টিউশনির পাশাপাশি শ্রমিকের কাজও করেছে। এখন তাকে কলেজে ভর্তি করতে হবে। এ নিয়ে তাঁরা চিন্তায় আছেন।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর ও সুনামগঞ্জ এবং প্রতিনিধি, নীলফামারী ও কেশবপুর, যশোর]
নোট: প্রথম আলোর প্রিন্টে ছাপা হয়েছে ২৩ আগস্ট ২০২৫ তারিখ, পাতা ৬।