সাক্ষাৎকার

এত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমি যদি পারি, বাকিরা অবশ্যই পারবে— অদম্য শারমিন

প্রথম আলো ট্রাস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে’। এই আয়োজনে আমরা সেই অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে কথা বলি যিনি তার আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন সফল হয়েছেন, নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। এমনি একজন অদম্য মেধাবীকে নিয়ে গত ১১ নভেম্বর ২০২৫, মঙ্গলবার, বিকেল ৫টায় আয়োজন করা হয় এই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের এ পর্বের অতিথি ছিলেন ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য তহবিল থেকে শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া নওগাঁর মান্দা উপজেলার সাহাপুকুরিয়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেয়ে মোছা. শারমিন পারভিন। করেছেন। সম্প্রতি তিনি রেজিস্টার্ড নার্স লাইসেন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের অপেক্ষায় আছেন। বাবা-মার ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পর নানাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেছেন তিনি। তাঁর জীবনের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় এই অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। সাক্ষাৎকারটি অনুলিখন করেছেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. নাজিম উদ্দিন।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

কেমন আছেন শারমিন পারভিন?

মোছা. শারমিন পারভিন: আলহামদুলিল্লাহ ম্যাম, আপনি কেমন আছেন?

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

ভালো আছি শারমিন। আপনাদের সঙ্গে যখন কথা বলি তখন আরও বেশি ভালো থাকিে। শারমিন, একদম ছোটবেলার গল্পটা শুনতে চাই। কেমন ছিল আপনার ছোটবেলা?

মোছা. শারমিন পারভিন: আমার ছোটবেলা একদম সবার থেকে আলাদা ছিল। কারণ সবাই সবার মা-বাবার সঙ্গে বড় হয়, আমি বড় হয়েছি আমার মায়ের সঙ্গে আর নানা-নানির সঙ্গে। যখন আমার বয়স তিন মাস তখন আমার বাবা আমাকে রেখে চলে যায়। অনেক কষ্ট করে আমার মা ও আমার নানা-নানি আমাকে বড় করছেন। ছোটবেলা একটা স্বপ্ন ছিল যে বড় হয়ে ডাক্তার হব। সবাইকে বলতাম যে আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব। এ রকম ভাবে কখনো ভাবি নাই যে আমার স্বপ্নগুলো পূরণ হবে কিনা, কারণ আমাদের জীবন ছিল অনেক কষ্টের। পান্তা খাওয়ার মতোও ব্যবস্থা ছিল না। আমার নানা-নানি অনেক কষ্ট করছে আমার জন্য। আমার মা মানুষের বাসায় কাজ করে আমাকে ছোটবেলায় মানুষ করছেন। স্কুল লাইফে অনেক ভালো রেজাল্ট করতাম। আমার স্কুলের টিচাররা আমাকে অনেক হেল্প করত। নানা-নানির ভালোবাসা ছিল। কিন্তু আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন আমার নানা-নানি এক সাথেই মারা যান। কথায় বলে না, ‘মাথার ওপর যদি কোন ছাতা না থাকে তাহলে তার পথ চলাটা অনেক কঠিন। নানা-নানি মারা যাওয়ার পর আমার মায়ের মাথার ওপরে কেউ ছিল না। এমতাবস্থায় আমার পড়াশোনাটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। সেই সময় আমি অনেকটাই ভেঙে পড়ছিলাম যে, হয়তো বা আমার ডাক্তার হওয়ার যে স্বপ্ন বা আমি যে আমার মায়ের পাশে দাঁড়াব সেটা হয়তোবা পূরণ হবে না।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

তারপর কী হলো?

মোছা. শারমিন পারভিন: তারপরে আমি এসএসসিতে জিপিএ গোল্ডেন পাই গ্রামের স্কুল থেকে। সবাই বলত যে, ওর তো কেউ নাই, ওর মা কি করে ওকে পড়াশোনা করাবে? ওই সময়টাতে আমার পাশে দাঁড়ায় প্রথম আলো। আমাকে নিয়ে প্রতিবেদন করে এবং আমাকে শিক্ষাবৃত্তি দিল। সেই সহায়তায় পড়াশোনা চালিয়ে নিলাম। যা হোক ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি কিন্তু নার্সিংয়ে আসছি। মানুষের সেবা করতে পারব—এটাই কম কিসের। আমি ভাবতাম যে, হয়তো আমার পড়াশোনা শেষ পর্যন্ত হবেই না। আমি আল্লাহর কাছে লাখো লাখো শুকরিয়া জানাই এবং আমার মায়ের ঋণ কখনো শোধ করতে পারব না। আমার মা যদি পাশে না থাকত বা আমার ভালোবাসার মানুষগুলো যারা আমাকে ছোটর থেকে অনেকটা হেল্প করছে, তাদের প্রতি অনেক অনেক কৃতজ্ঞ। কারণ আর দশটা মেয়ের মতো ছোটবেলা আমার অতটা সহজ ছিল না।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

মায়ের শক্তি, মায়ের দোয়া আসলে আমরা কোন কিছুর সঙ্গে তুলনা দিতে পারব না। আপনি নিজেই আপনার জীবন থেকে সেটা দেখেছেন। হয়তো আপনি ডাক্তার হতে পারেননি। কিন্তু আপনি মানুষের সেবা করতে চেয়েছিলেন, সেই মানুষের সেবা করার পথেই আছেন। এখন শুধু প্রফেশনালি কোনো একটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বাকি। এ পর্যন্ত আসতে গিয়ে কখনো কি মনে হয়েছে যে, আর হয়তো পারব না?

মোছা. শারমিন পারভিন: এ রকম মনে হয়েছে অনেক। মাঝেমধ্যে যখন প্রচুর চাপ থাকত যে, আমার মা মানুষের বাসায় কাজ করছে, আমি রাজশাহীতে চার বছর ধরে আছি। আমার মা মানুষের বাসায় কাজ করে বিকেল টাইমে আসছে। আবার এমনও হইতো যে, আমার কলেজের সেশন ফি বা ফরম পূরণের টাকা দিতে হবে বা রুম ভাড়া দিতে হবে। এদিকে আমার মা কাজ করে আসে, শরীরের অবস্থা খুব খারাপ থাকে, তখন মা বলে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তখন খুব অসহায় মনে হতো যে, আমি কি পরিস্থিতিতে আসলাম, না পারছি নার্সিং শেষ করতে, না পারছি আমি কোনো একটা জব করতে, না পারছি মায়ের পাশে দাঁড়াতে। আমার দ্বারা মনে হয় এইটুকু সময় আর পার করা যাবে না। কিন্তু আবার মনে হইতো আমাকে পারতেই হবে। কারণ দিন শেষে আমার মাকে দেখার মতো আমি ছাড়া কেউ নাই। সে ক্ষেত্রে আমাকে অবশ্যই সামনে ভালো কিছু করতে হবে, আমার মায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনি নার্স হিসেবে রেজিস্ট্রেশনের প্রসেসটা কমপ্লিট করেছেন। এটা আপনাদের মা-মেয়ের প্রথম বিজয়। এখন যারা অদম্য মেধাবী আছে তাদের যদি একটু পরামর্শ দেন যে, খারাপ সময়গুলোতে কেমন করে মোটিভেশন ধরে রাখা যায়।

মোছা. শারমিন পারভিন: আমার মনে হয়, পড়াশোনার লাইফ বা এমনি লাইফে চলার সময় অবশ্যই বাধা আছে বা সুখ-দুঃখ আছে। সে ক্ষেত্রে একটা কথাই বলব যে, ভেঙে পড়া যাবে না। ভাবতে হবে, আমার দ্বারা কিছু হবে, আমি পারব। আমি যদি চেষ্টা করি আমি অবশ্যই পারব। চেষ্টা করলে সবকিছু সম্ভব। আমি কেন পারব না? আর ১০ জন যদি পারে তাহলে আমি পারব। আমার এমনও দিন গেছে যে আমি না খেয়ে পড়তে হয়েছে। আমি ছোট থেকে এত বড় হয়েছি আমি আমার চাহিদা মতো কোনো কিছুই আমি পাইনি। কিন্তু আমি থেমে যাইনি, আমি চেষ্টা করে গেছি। এমনও হয়েছে, আমি বই কিনতে পারিনি কিন্তু আমি আরেকজনের বই থেকে নোট করে নিতাম। এভাবে আল্লাহর রহমতে আমার নার্সিংয়ে প্রত্যেকটা ইয়ারে জিপিএ-৪ এর মধ্যে ৩.৯৭ বা ৩.৯৫ এ রকম রেজাল্ট করেছি। সুতরাং একটা কথাই বলব, আমি যদি পারি কেন তারা পারবে না। তারা অবশ্যই পারবে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

অনুষ্ঠান শেষ করবার আগে আপনার মায়ের জন্য আপনি কিছু বলতে চান কিনা?

মোছা. শারমিন পারভিন: আমার মা এখনো মানুষের বাসায় কাজ করছে প্রায় দুই-তিনটা বাসায়। আমার মাকে কাজ থেকে মুক্তি দিতে হবে আমাকে। এখন আমি সিভি ড্রপ করছি প্রত্যেকটা ক্লিনিক হাসপাতালে। আমার মেইন টার্গেট হচ্ছে সরকারি চাকরি। সরকারি চাকরির জন্য যে পড়ব বা প্রস্তুতি নিব সেটার জন্য ভালো থাকা জরুরি। সে ক্ষেত্রে অন্তত একটা প্রাইভেট ক্লিনিক বা হসপিটালে সিভি দিচ্ছি, সেগুলাতে যদি হয়, অন্তত নিজের খরচ এবং আমার মাকে অন্তত একটু রিলিভ দিতে পারি। অন্তত মাকে যেন বলতে পারি যে, মা তুমি তোমাকে আর কাজ করতে হবে না। আমার দিন শেষে একটাই চাওয়া, আমার মা যেন ভালো থাকেন, সুস্থ থাকেন, সুন্দর থাকেন। আমার মাকে যেন দিন শেষে বলতে পারি, মা তোমার যেটা খেতে মন চাইবে তুমি সেইটাই খাও। আমার ইচ্ছা মাকে যেন ভালো রাখতে পারি এবং আমি যেন একটা সরকারি চাকরি পাই।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনার এই সুন্দর ইচ্ছা খুব দ্রুতই পূরণ হোক। ধন্যবাদ আপনাকে এই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য। আপনি এবং আপনার মা অনেক ভালো থাকবেন, এই শুভকামনা থাকল।

মোছা. শারমিন পারভিন: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।