সাফল্য

‘মেয়েদের পড়াশোনা করিয়ে কী হবে?’—সমাজের এই প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে মমিনা আজ বিসিএস ক্যাডার

প্রথম আলো ট্রাস্টের নিয়মিত আয়োজন যাঁরা দেখেন, তাঁরা জানেন আমরা প্রতি মাসে একজন অদম্য মেধাবীর সংগ্রামের গল্প শুনি। আর্থিক, পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমাদের এই অদম্যরা কীভাবে স্বপ্ন পূরণ করেন, তা থেকে আমরা কঠিন সময়েও ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস পাই। আজকে আমরা গল্প শুনব ৪৭তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত রংপুর জেলার বদরগঞ্জের অদম্য মেধাবী মোছা. মমিনা খাতুনের। তিনি ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবী শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে এইচএসসি ও স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে পড়াশোনা করেছেন। গত ৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, বেলা ৩টা ‘অদম্য মেধাবীর সঙ্গে’ অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। সাক্ষাৎকারটি অনুলিখন করেছেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. নাজিম উদ্দিন।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

মমিনা, কেমন আছেন আপনি?

মোছা. মমিনা খাতুন: আলহামদুলিল্লাহ, আপনি কেমন আছেন?

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

ভালো আছি। আপনাকে প্রথমেই অভিনন্দন! বিসিএস যুদ্ধ জয়ের পর আপনার ছোটবেলার গল্পটা শুনতে চাই। কেমন ছিল আপনার ছোটবেলা?

মোছা. মমিনা খাতুন: আমি একদম প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পড়াশোনা শেষ করেছি। সাধারণত আমার গ্রাম বা আশপাশ থেকে মেয়ে তো দূরের কথা, ছেলেদের মধ্যেও গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার মতো কেউ ছিল না। ক্লাস এইটে যখন ক্লাসে সেকেন্ড হলাম, তখন মনে হলো চেষ্টা করলে আরও ভালো করা সম্ভব এবং নাইনে প্রথম হই। তখন আমাদের এলাকায় ভালো পড়াশোনার গণ্ডি বলতে কেবল ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটাই জানতাম, কারণ এর বাইরে ইউনিভার্সিটি বা বুয়েট সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। তাই ছোটবেলায় ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নই দেখতাম।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

গ্রামের বাড়ি থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং শহরে এসে পড়াশোনা করা—এই যাত্রায় পারিবারিক ও সামাজিক বাধা কেমন ছিল?

মোছা. মমিনা খাতুন: আমার বাবা-মা সরাসরি বাধা না দিলেও পারিপার্শ্বিক চাপ ছিল প্রচুর। ভালো রেজাল্ট করার পরেও কথা শুনতে হয়েছে—‘মেয়ে পড়াশোনা করে কী করবে, অন্য বাড়িতে তো চলেই যাবে?’ প্রতিবেশি অন্যান্য আত্মীয়রাও বলত এসএসসির বেশি পড়াশোনার দরকার নেই, বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। এখনো সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, ছেলেদের পড়াশোনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, মেয়েদের ক্ষেত্রে সেই পিছিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থাকে। তবে আমার বাবা আমাকে নিয়ে কিছুটা সন্দিহান হলেও আমার দেওয়া যুক্তিতে ভরসা রেখেছিলেন।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

এরপর প্রথম আলোর শিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং শহরের কলেজে এসে পড়াশোনার দিনগুলো কেমন ছিল?

মোছা. মমিনা খাতুন: এসএসসিতে ভালো রেজাল্টের পর প্রথম আলোর অঞ্চল প্রতিনিধির মাধ্যমে আমি প্রথম আলোর শিক্ষাবৃত্তির সহযোগিতা পাই। এই বৃত্তি না পেলে হয়তো আমার পড়াশোনা ওখানেই থেমে যেত। এরপর শহরের সরকারি কলেজে ভর্তি হলেও আর্থিক সংকটের কারণে প্রথম ছয় মাস কোনো প্রাইভেট পড়তে পারিনি। তখন প্রথম আলোর প্রতিনিধির সহায়তায় একটি টিউশন জোগাড় করি, যা আমার পড়াশোনার খরচ চালাতে এবং পেছনের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে অনেক বড় সাহায্য করেছিল।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের সেই পথচলাটা কেমন ছিল?

মোছা. মমিনা খাতুন: মেডিকেলে চান্স না পেয়ে প্রথমে ভেঙে পড়েছিলাম। কারণ ছোটবেলা থেকে শুধু ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটাই জানতাম। পরে রাজশাহী ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে কৃষিতে সুযোগ পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে প্রথম সেমিস্টারে রেজাল্ট খারাপ হলেও পরে নিজের মানসিক শান্তির জন্য এবং নিজের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে পড়াশোনায় দারুণ কামব্যাক করি এবং ৩.৭৭ সিজিপিএ নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করি।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনার এই সাফল্যে আপনার বাবা-মার অনুভূতি কেমন?

মোছা. মমিনা খাতুন: আমার বাবা-মা এখন অনেক বেশি খুশি। একসময় যারা নানা কথা বলতো, তারাই এখন বলে—‘অমুকের মেয়ে তো প্রশাসনের ক্যাডার হয়েছে।’ বাবা এখন অনেক গর্ব করে জানান যে এলাকার সবাই এখন তাঁকে চেনেন। এই বিষয়টি আমার কাছে ভীষণ ভালো লাগে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনার নিজের কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা স্বপ্ন আছে কি? বিশেষ করে আপনার এলাকার সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের নিয়ে কিছু করার ইচ্ছা আছে কি?

মোছা. মমিনা খাতুন: অবশ্যই ইচ্ছা আছে। আমাদের এলাকায় মেয়েদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সাপোর্ট দেওয়া হয় না—এই ভুল ধারণা ও ব্যবধান আমি ভাঙতে চাই। এলাকার পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মেয়েরা সুযোগ পেলে অনেকদূর এগিয়ে আসবে। এ নিয়ে আমার মাথায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে, যা সময়মতো বাস্তবায়ন করব।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

এই দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ের সময়ে আপনার মনোবল জোগাতো কে বা কোন বিষয়টি? কখনো কি মনে হতো যে হেরে যাচ্ছেন?

মোছা. মমিনা খাতুন: মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে আমি কখনোই পুরো গোলটাকে একসঙ্গে বিশাল করে দেখতাম না, বরং ছোট ছোট লক্ষ্য বা গোলে ভাগ করে নিতাম। ছোট গোলগুলো যখন পূরণ হতো, তখন পরের ধাপ পার হওয়ার আত্মবিশ্বাস পেতাম। আর মানসিকভাবে প্রথম আলো ট্রাস্ট থেকে সবসময় খোঁজ রাখতেন, অনুপ্রেরণা দিতেন। তিনি বলতেন—‘আরেকটু সামনে... আরেকটু সামনে গেলে হয়তো তোমার সফলতা আসবে।’ এই ছোট ছোট পদক্ষেপের ভাবনাটাই আমার পথ চলা সহজ করেছিল।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

সবশেষে আপনার এই যাত্রার পেছনের মানুষদের প্রতি আপনার অনুভূতি কী?

মোছা. মমিনা খাতুন: শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আমার শিক্ষাজীবনে যাঁরা অবদান রেখেছেন—আমার স্কুলের শিক্ষকবৃন্দ, প্রথম আলো ট্রাস্ট, ব্র্যাক ব্যাংক ও আরও যাঁরা পাশে দাঁড়িয়েছেন—সবার প্রতি আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ। সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় আজ আমি এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

অনেক ধন্যবাদ মমিনা, আপনার জন্য রইল আমাদের এবং আপনার বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে অনেক শুভকামনা। আপনি আপনার পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনে সততা বজায় রেখে মানুষের সেবা করে যাবেন এবং দেশ ও সমাজের মুখ উজ্জ্বল করবেন—এই প্রত্যাশাই রইল।

মোছা. মমিনা খাতুন: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ আমার পাশে থাকার জন্য। আমার জন্য দোয়া করবেন যেন আমি সৎ থেকে আমার পেশাগত দায়িত্ব সুনামের সহিত পালন করতে পারি।