আমাদের সঙ্গে আজকের এই আয়োজনে আছেন মো. আমিনুল হক মাখন। যিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেকে তৈরি করেছেন এবং সম্প্রতি ৪৬ তম ও ৪৯ তম—দুটো বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। আজকের এই আয়োজনে আমরা তাঁর দীর্ঘ পথচলার গল্প শুনব। মাখন, আপনাকে আমাদের অনুষ্ঠানে স্বাগত জানাচ্ছি। আপনি কেমন আছেন?
মো. আমিনুল হক মাখন: আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো আছি। আপনাদের এই সুন্দর আয়োজনে আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ।
মাখন, আমরা জানি আপনি ৪৬ তম এবং ৪৯ তম—উভয় বিসিএস পরীক্ষাতেই সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছেন। একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর জন্য এটা নিঃসন্দেহে অনেক বড় অর্জন। শুরুতেই যদি আপনার কাছ থেকে একটু শুনতে চাই, আপনি মূলত কোন ক্যাডারগুলোতে সুপারিশ প্রাপ্ত হলেন এবং আপনার অনুভূতিটা কেমন?
মো. আমিনুল হক মাখন: আসলে বিসিএস যাত্রাটা আমার জন্য সব সময়ই বিশেষ ছিল। আমি প্রথমত ৪৯ তম বিসিএস—যা একটি বিশেষ বিসিএস ছিল—সেখান থেকে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হই। পরবর্তীতে ৪৬ তম বিসিএসেও আমি শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হই। সব মিলিয়ে এটা আমার এবং আমার পরিবারের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।
আপনার এই সফলতার পেছনের গল্পটি শোনার আগে আমরা একটু অতীতে ফিরে যেতে চাই। ছোটবেলায় মাখনের স্বপ্নগুলো কেমন ছিল? স্বপ্নগুলো কি শুরু থেকেই এমন বড় ছিল, নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে?
মো. আমিনুল হক মাখন: আসলে সময়ের সঙ্গেসঙ্গে স্বপ্নের ধরন এবং বিস্তৃতি অনেকটা বদলে গেছে। যদি খোলামেলা বলি, ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আমার স্বপ্নগুলো খুব সাধারণ ছিল। তখন আমার ভাবনা ছিল—পড়াশোনা করব, ফ্যামিলি দেখাশোনা করব। খুব হাই অ্যাম্বিশন বলতে যা বোঝায়, তা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত ছিল না। তবে ক্লাস এইটে ওঠার পর আমার চিন্তাভাবনাগুলো বেশ সংগঠিত হতে থাকে। আমি অদ্ভুতভাবে নিজের লাইফের একটি চার্ট বা প্রেডিকশন করেছিলাম।
এটা বেশ কৌতূহল উদ্দীপক। আপনি কি আগে থেকেই আপনার রেজাল্ট বা ক্যারিয়ার সম্পর্কে কিছু প্রেডিক্ট করে রেখেছিলেন?
মো. আমিনুল হক মাখন: হ্যাঁ, অনেকটা সেরকমই। ক্লাস এইটে পড়ার সময় আমি কল্পনা করতাম, আমার অষ্টম শ্রেণির রেজাল্ট হয়তো খুব একটা ভালো হবে না। কিন্তু এসএসসি লেভেলে আমি আউটস্ট্যান্ডিং বা অসাধারণ রেজাল্ট করব। আবার ইন্টারমিডিয়েট বা এইচএসসিতে হয়তো খুব আহামরি ভালো হবে না, বরং গড়পড়তা বা এভারেজ একটি ফলাফল হবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাব। যদিও আমি ভেবেছিলাম আমার সিজিপিএ খুব ভালো হবে না, কিন্তু ভালো একটি চাকরি পাব। মজার বিষয় হলো, বাস্তবতা অনেকটাই আমার সেই কল্পনার সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।
আপনার কথা অনুযায়ী, আপনার এসএসসি রেজাল্ট ভালো ছিল, এইচএসসিতে এভারেজ ছিল এবং আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বিষয় নিয়ে পড়তেন?
মো. আমিনুল হক মাখন: আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ কল্যাণ বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।
আচ্ছা, যখন আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে ছিলেন বা তার আগে থেকেই সরকারি চাকরির প্রতি আপনার আগ্রহটা কীভাবে জন্মাল? কখন আপনি নিজেকে পুরোপুরি ডিটারমাইন করলেন যে আপনাকে বিসিএস ক্যাডার বা সরকারি চাকরির মতো সম্মানজনক অবস্থানেই যেতে হবে?
মো. আমিনুল হক মাখন: একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই আমি বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা শুরু করি। আমি লক্ষ্য ঠিক করে ফেলি যে, বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির চাকরিগুলো—বিশেষ করে বিসিএস ক্যাডার, বাংলাদেশ ব্যাংকের এডি বা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার—এগুলো আমার হওয়া প্রয়োজন। আমি তখন থেকেই এই লক্ষ্যগুলো নিয়ে ভাবতাম। সরকারি চাকরির প্রতি আমার এই একাগ্রতা বা ডিটারমিনেশন সেই সময় থেকেই গড়ে ওঠে। যদিও শুরুতে মনে হতো আমি ফরেন ক্যাডার বা অ্যাডমিন ক্যাডার হব, কিন্তু বাস্তবতা হলো, পরীক্ষার রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করেই শেষ পর্যন্ত ক্যাডার নির্ধারিত হয়।
এটা খুবই বাস্তবসম্মত কথা। তবে প্রস্তুতির এই দীর্ঘ সময়ে কি এমন কখনো মনে হয়নি যে পড়াশোনাটা ভীষণ কঠিন, আপনি যেভাবে পরিশ্রম করছেন সে অনুযায়ী ফলাফল আসছে না? এমন হতাশার সময়ে নিজেকে সামলানোর কৌশল কী ছিল আপনার?
মো. আমিনুল হক মাখন: পড়াশোনার ব্যাপারে আমি সব সময়ই একটি নির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজি ফলো করে আসছি। আমার সহপাঠীরা ভালো করলে আমার খারাপ লাগত না, বরং আমি নিজের ঘাটতিগুলো খুঁজে বের করতাম। যদি কখনো রেজাল্ট খারাপ হতো, আমি নিজেকে বোঝাতাম যে—হয়তো আমার পরিশ্রমের জায়গায় ঘাটতি ছিল, আমাকে আরও পড়তে হবে। আমি কখনো থেমে থাকিনি। রেজাল্ট খারাপ হলে আমি উল্টো পড়াশোনার মাত্রা বাড়িয়ে দিতাম, যাতে পরের বার ভালো করতে পারি।
এই মানসিকতাই আসলে আপনাকে সফল হতে সাহায্য করেছে। মাখন, আমরা আপনার জীবনের একটি কঠিন সময়ের কথা জানি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আপনি আপনার বাবাকে হারিয়েছিলেন। সেই সময় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং মানসিকভাবে টিকে থাকা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল? আপনার এই পথচলায় কি কোনো বিশেষ মেন্টর বা শিক্ষক ছিলেন যিনি আপনাকে শক্তি জুগিয়েছেন?
মো. আমিনুল হক মাখন: বাবা মারা যাওয়ার পর (২০১২ সালে) আমি ক্লাস এইটে পড়তাম। তখন মানসিকভাবে আমি খুবই বিপর্যস্ত ছিলাম, ফ্যামিলির প্রেশার ছিল, পড়াশোনাতেও ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। তবে আমার জীবনে একজন মানুষের অবদান আমি কখনো ভুলতে পারব না। তিনি আমার শ্রদ্ধেয় স্যার জনাব জহরুল ইসলাম সোহাগ। তিনি বর্তমানে একটি প্রাইমারি স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। আমি স্যারের নজরে আসি যখন আমি ক্লাস সেভেন পড়ি। এরপর থেকে তিনি আমাকে খুব কাছ থেকে নার্সিং করেছেন।
স্যার এমন কী বলেছিলেন যা আপনার জীবন দর্শন বদলে দিয়েছিল?
মো. আমিনুল হক মাখন: স্যার আমাকে একটি অদ্ভুত কিন্তু শক্তিশালী উপমা দিয়েছিলেন। স্যার জিজ্ঞেস করেছিলেন, "মাখন, তোমাকে যদি আমি এই মুহূর্তে একটা হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করি, তুমি কী করবে? " আমি বললাম, "স্যার, আমি হাত দিয়ে সেটা প্রতিহত করার চেষ্টা করব। " স্যার তখন বললেন, "হাত দিয়ে প্রতিহত করলে তো তোমার হাতে ব্যথা পাবে বা হাতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তখন তুমি কী করবে? হাত বাঁচাবে নাকি মাথা বাঁচাবে? " আমি বললাম, "স্যার, অবশ্যই হাত দিয়ে প্রতিহত করব, কারণ মাথাকে সেভ করা জরুরি। "
স্যার তখন আমাকে বুঝিয়েছিলেন— "ঠিক এই কাজটাই তোমাকে মনে রাখতে হবে। তোমার পড়াশোনা হচ্ছে তোমার মাথার মতো, আর বাহ্যিক যত সমস্যা বা কাজ—সেগুলো তোমার হাতের মতো। হাত অর্থাৎ বাহ্যিক কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তুমি টিকে থাকতে পারবে, কিন্তু মাথা অর্থাৎ পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তুমি কখনোই সারভাইভ করতে পারবে না। " স্যারের এই কথাটি আমার মস্তিষ্কে গেঁথে গিয়েছিল। সেই থেকে আমি সমস্ত বাহ্যিক ঝামেলা থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে পড়াশোনায় পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছিলাম।
শিক্ষকেরা যে এভাবে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন, তার জ্বলন্ত উদাহরণ আপনার এই গল্প। শিক্ষকের সেই শিক্ষা আপনাকে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। মাখন, এখন আমরা যদি আপনার আগামী ৫ বছরের পরিকল্পনার কথা জানতে চাই—নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
মো. আমিনুল হক মাখন: আমার উত্তরটি দুই ভাগে বিভক্ত। যদি ৫০ তম বিসিএসে আমি কাস্টমস ক্যাডারে কোয়ালিফাই করতে পারি, তবে আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু যদি সেটা না হয়, তবে আমি সম্পূর্ণভাবে শিক্ষা ক্যাডারের দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করব। আমি শিক্ষা ক্যাডারের সাথেই যুক্ত থেকে এমফিল, পিএইচডি এবং বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে চাই। আমি চাই এই সেক্টরে এমনভাবে গড়ে উঠতে, যেন নিজেকে পুরোপুরি এই পেশার জন্য উৎসর্গ করতে পারি।
আপনার এই স্বপ্ন পূরণের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে শুভকামনা। আপনি একজন অদম্য মানুষ, আমরা বিশ্বাস করি আপনি যেখানেই থাকুন সফল হবেন। আলোচনার শেষ প্রান্তে এসে আপনার পরিবারের অনুভূতি জানতে চাই। পড়াশোনা শেষ করে যখন আপনি একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে হাঁটছেন, পরিবারের মানুষগুলোর প্রতিক্রিয়া কেমন?
মো. আমিনুল হক মাখন: এই জার্নিটা মুখে বলে বোঝানো কঠিন। আমার এই দীর্ঘ যাত্রায় আমার স্ত্রী যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তার কাছে আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। আমার দাদি বেঁচে নেই, তিনি আমার সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। তবে আমার মা, আমার জ্যাঠা—তাদের আনন্দের মাত্রা ছিল আকাশচুম্বী।
আপনার মা এবং জ্যাঠা কি আপনার ক্যাডার চয়েস নিয়ে খুব একটা ভাবেন?
মো. আমিনুল হক মাখন: না, ওনাদের কাছে সেটা ফ্যাক্টর না। ওনাদের কথা হচ্ছে, বিসিএস ক্যাডার হয়েছি—এটা নিয়েই তারা অসম্ভব খুশি। আমার জ্যাঠা তো পুরো এলাকায় মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন। আমার মা আমার নানির বাড়িতে থাকেন, ওনার যে উত্তেজনা ছিল তা দেখার মতো। আসলে আমাদের ওপর তাদের সেই বিশ্বাস এবং ভরসাটা সব সময়ই ছিল যে আমি সফল হব। আর আমার স্ত্রী যখন খুশি হয়, তার সেই খুশিটা দেখে আমি নিজে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি, কারণ এই সাফল্যের পেছনে তার ত্যাগ অনেক।
আপনাদের এই আনন্দই আমাদের প্রাপ্তি। মাখন, আজ আমরা আপনার জীবনের গল্প শুনলাম—শৈশবের স্বপ্ন, সংগ্রামের দিন, শিক্ষকের উপদেশ, আর পরিবারের ভালোবাসা। আপনি আপনার ভবিষ্যৎ জীবনে, পেশাগত জীবনে এবং ব্যক্তিগত জীবনে ভীষণ ভালো থাকুন, সফল হোন—এই শুভকামনা সব সময় আমাদের পক্ষ থেকে থাকবে।
মো. আমিনুল হক মাখন: আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য এবং সুন্দর এই কথোপকথনের জন্য আপনাদের অনেক ধন্যবাদ।