প্রথমেই আপনার ছোটবেলার গল্পটা জানতে চাইব। আপনার ছোটবেলাটা কেমন ছিল?
মো. আলী হোসেন: আমাদের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কেদারনগর গ্রামে। আমাদের গ্রামটা আলমডাঙ্গা উপজেলা থেকে বেশ দূরে, ১৫ কিলোমিটার মতো দূরে। ২০০১ সালে আমার স্কুলের জার্নি শুরু। আমি কাশিপুর কেদারনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু। আমি যে সময় পড়েছি আমাদের গ্রামে অত বেশি শিক্ষিত মানুষ ছিল না, একেবারেই ছিল না। ওই সময়ে কাউকে দেখে ইন্সপায়রেশন পাওয়ার বা কাউকে দেখে বড় হওয়ার বিষয় ছিল না। পরবর্তীতে আমি প্রাইমারি স্কুল শেষ করে যখন হাই স্কুলে যাব, তখন পাশে বাজারের দিকে একটা হাই স্কুল ছিল। সেখানে আমার ভর্তি হওয়া এবং সেখানে স্যারদের থেকে একটু জানতে পাওয়া যে, এর পরবর্তী লাইফটা কেমন, আমরা কোন গ্রুপে পড়াশোনা করলে কী হতে পারব বা কোনটা আমাদের লাইফে উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
এসএসসিতে যখন এ প্লাস পেলেন, জিপিএ ফাইভ পেলেন, তখন তো মোটামুটিভাবে একটা ধারণা হয়েছিল যে সায়েন্স নিয়ে পড়লে কোন কোন দরজা খুলে যাবে প্রফেশনে। আর্টস, কমার্স নিয়ে পড়লে প্রফেশনে কোন কোন দরজা খোলা থাকতে পারে। আসলে কী ভাবতেন? আসলে আপনার পরিকল্পনা কী ছিল?
মো. আলী হোসেন: সায়েন্স থেকে পড়াশোনা করলে এই ওয়েগুলো আমার জন্য ওপেন হবে বা কমার্স থেকে এই ওয়েগুলো ওপেন হবে অর আর্টস থেকে এগুলো—এ ধরনের কোনো ধারণা পাইনি। আমি স্কুল লাইফে জাস্ট পড়াশোনা করেছি যে ভালো কিছু করব, আমার রেজাল্ট ভালো হোক, আমি বেশ সামনের দিকে এগিয়ে দেখতে চেয়েছি সব সময় যে আমার রেজাল্ট যেন সব সময় খুব ভালো হয়। আমার স্বপ্ন ছিল এটাই। তবে আমার স্কুল শিক্ষকেরা বলেছিলেন যে, আমি সায়েন্স নিলে ভালো করতে পারব। ওখান থেকে সাইননেওয়া এবং আল্লাহর রহমতে এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস এসেছিল। পরবর্তীতে আমার একজন ভাইয়াকে দেখেছিলাম যিনি যশোরে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁকে দেখেই যশোর ক্যান্টনমেন্টে ভর্তি হয়েছিলাম।
তারপর যখন কলেজে উঠলেন, কলেজ থেকে যখন ধারণা পেলেন যে প্রফেশনের এই এই জায়গাগুলো মানে সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য আছে এবং পড়াশোনা ভালো করতে হবে। সবকিছু মিলে ওই সময়টাতে আপনি কি আপনার গোল সেট করেছিলেন? আপনার পেশাগত স্বপ্নটা কখন থেকে দেখা শুরু হয়?
মো. আলী হোসেন: আমার স্বপ্নটা কলেজ লেভেল থেকে দেখা শুরু। কলেজে যখন আমরা ভর্তি হই, স্বপ্ন দেখি যে আমরা কলেজ লেভেল ভালো করে একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে হবে। ভালো রেজাল্ট নিয়ে আমরা আন্ডার গ্র্যাজুয়েট সম্পূর্ণ করব। ওখান থেকে স্বপ্ন দেখি এবং কলেজ লাইফের শেষ মুহূর্ত থেকে আমি গোল সেট করি যে ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে যাব।
আচ্ছা, সেই স্বপ্ন পূরণ হলো এবং আপনি আপনার পেশাগত জীবনে পা রাখলেন, কাজ শুরু করলেন। অনেক অভিনন্দন আপনাকে। এবার একটু বাড়িতে ফিরে যেতে চাই। বাড়ির লোকেরা, বাবা-মা—তাঁদের অনুভূতি কি এখন?
মো. আলী হোসেন: বাড়িতে সবাই খুবই খুশি। আমার এই পর্ব পর্যন্ত আসা আসতে পেরেছি আল্লাহর রহমতে এবং আপনাদের সহযোগিতায় সে জন্য আব্বু-আম্মু এবং আমার গ্রামবাসী যারা আছেন সবাই অনেক অনেক খুশি. . অনেক অনেক খুশি।
আপনার পরবর্তী স্বপ্নটা কী? আপনি যে চাকরিটা করছেন বা যেখানে আপনি কাজ করছেন, সেখানে তো নিশ্চয়ই আপনি ভালো করুন—আমাদের সেই শুভকামনা থাকবে। তারপরও আরও কি কোনো স্বপ্ন আছে আপনার?
মো. আলী হোসেন: আমি এখানে পেশাগত ইঞ্জিনিয়ারিং একটা সেক্টরে কাজ করেছি। আমার সেক্টরটাতে আমাদের দেশের জন্য আরও কাজ করার ইচ্ছা আছে। আমার অর্পিত দায়িত্ব সুন্দরভাবে কমপ্লিট করার এবং নিজেকে আর ডেভেলপ চেষ্টা আছে।। সে জন্য উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে যাওয়া একটা স্বপ্ন আছে।
সেটার জন্য প্রস্তুতি কি শুরু হয়ে গেছে? না নিজেকে একটু সময় দিচ্ছেন যে আরেকটু কাজ করি, আরেকটু স্টেবল হই, তারপর প্রস্তুতি নিব?
মো. আলী হোসেন: আরেকটু কাজ করে স্টেবল হয়ে তারপর বাইরে যেতে চাই। আমার ডিপার্টমেন্টাল পড়াশোনা এবং বাইরে যাওয়ার জন্য যেসব পড়াশোনা প্রয়োজন এগুলো একটু একটু করে দেখার চেষ্টা করছি।
আচ্ছা, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই। আপনি বলছিলেন যে আপনি যখন স্কুল লাইফটাতে ছিলেন, তখন আপনার আসলে সায়েন্স, আর্টস, কমার্স কোন বিষয়টা নিয়ে পড়াশোনা করলে পেশাগত জীবনের সুযোগ বেশি আছে—এগুলো নিয়ে ধারণা ছিল না। সেই আপনি যখন কলেজে গিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লেন, শেষ করলেন পড়াশোনা, তারপর একটা চাকরি জীবনে প্রবেশ করলেন। এই পুরো সময়টাতে বা পড়াশোনা করার সময় কখনো মনে হয়েছে যে আর বোধয় পারব না।
মো. আলী হোসেন: পড়াশোনাটাকে কখনো আমার কাছে প্রেশার মনে হয় নাই। কিন্তু আমার ফ্যামিলি ইকোনমিক্যালি, ফিন্যান্সিয়ালি অনেক বেশি পিছিয়ে ছিল। এদিক থেকে আমি একটু চিন্তিত ছিলাম যে, আমি হয়তো আমার লেখাপড়াটা কনটিনিউ করতে পারব কিনা। আমি যখন এসএসসি পাস করলাম তখন আমার এই চিন্তাটা অনেক বেশি ছিল।
এই সময়টাতে নিজের মোটিভেশন ধরে রাখলেন কীভাবে? নিজের সাহসটা ধরে রাখতেন কীভাবে?
মো. আলী হোসেন: আমার স্কুল লাইফের ফিন্যান্সিয়াল সমস্যা বেশি ছিল। বাবা চেষ্টা করতেন তবে অনেক সময় পারতেন না। তখন আমার মামারা সহায়তা করেছেন। আমি এসএসসি পর্যন্ত মামা বাড়ি থেকে অনেক বেশি সাপোর্ট পেয়েছি। সবকিছু মিলিয়ে এগিয়ে গেছি আরকি।
এখন যারা অদম্য মেধাবী আছেন, তাদের জন্য আপনার কোনো সাজেশন আছে কি? বড় ভাই হিসেবে তাদের কী পরামর্শ দেবেন?
মো. আলী হোসেন: আমার সাজেশন হলো, আমরা যদি পড়ালেখাটা ঠিকঠাক মতো ধরে রাখি, করতে পারি তাহলে ফিন্যান্সিয়াল যে সমস্যাটা থাকে সেটা কাটিয়ে উঠতে পারব আমরা ইনশাআল্লাহ। আমার ক্ষেত্রে যেমন আমি এসএসসির পরে প্রথম আলোর আমাদের জেলা প্রতিনিধি শাহ আলম সনি ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। উনি সবকিছু জেনে আমাকে নিয়ে প্রতিবেদন করেন। আমার শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা হয়। সুতরাং আমার ছোট ভাই যারা পড়াশোনা করছে তাদের বলব, কোনো চিন্তা করার দরকার নেই। লক্ষ্য ঠিক রেখে এগিয়ে যাও, কোনো না কোনো ব্যবস্থা হবেই। আমার বেলায় যেমনটা আপনারা দাঁড়িয়েছেন।
নিশ্চয়ই। আপনি আপনার মধ্যে সেই চেষ্টাটা ছিল বলেই আমাদের পাশে থাকাটাকে আপনি সফল করে তুলতে পেরেছেন এবং আমরা আমরা ভীষণ রকমের গর্ববোধ করি। আপনি আপনার স্বপ্নের কথা বলছিলেন। সেই স্বপ্নটার সঙ্গে যুক্ত করে আপনার যারা ছোটরা আছে তাদের জন্য যদি আপনার কোনো পরামর্শ থাকে।
মো. আলী হোসেন: প্রাইমারি এবং হাই স্কুল থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আমি কোন দিকে একটু বেশি ভালো। সায়েন্সের ম্যাথ, ফিজিকস এগুলো যদি আমার কাছে ভালো মনে হয় বা আমি ইন্টারেস্টেড ফিল করি তাহলে আমার মনে হয় তারা সায়েন্সের দিকে যেতে পারে। আর যারা মনে রাখতে পারে তারা আর্টস গ্রুপ বা কমার্স গ্রুপের দিকে যেতে পারে। আর যারা ম্যাথ সলভিং, প্রবলেম সলভিং করতে ভালো লাগে, তারা সায়েন্স গ্রুপ থেকে পড়াশোনা করে কলেজ শেষে ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল—এই দিকে যেতে পারে এবং তাদের গোল সেট করতে পারে।
অনেক ধন্যবাদ আলী হোসেন আপনাকে। আপনি পেশাগত জীবনে খুব ভালো করেন, আমাদের এই দোয়া ও শুভকামনা থাকবে আপনার প্রতি।
মো. আলী হোসেন: আপনাদেরও ধন্যবাদ। আমি প্রথম আলো ট্রাস্টের প্রতি অনেক অনেক কৃতজ্ঞ।