সাক্ষাৎকার

‘চলতে থাকা এবং হাল না ছাড়াই জীবন’—অদম্য মেধাবী রায়হান

প্রথম আলো ট্রাস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে’। এই আয়োজনে আমরা সেই অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে কথা বলি যিনি তার আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন সফল হয়েছেন, নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। এমনি একজন অদম্য মেধাবীকে নিয়ে গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার, বিকেল ৫টায় আয়োজন করা হয় এই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের এ পর্বের অতিথি ছিলেন ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য তহবিল থেকে শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া গ্রামে অদম্য মেধাবী রায়হান আজাদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে সম্প্রতি নিজের স্বপ্নের পেশা শিক্ষকতায় প্রবেশ করেছেন বর্তমানে তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়িতে অবস্থিত ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। তাঁর জীবনের সাফল্য ও নানা বিষয় ওঠে আসে এই অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। সাক্ষাৎকারটি অনুলিখন করেছেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. নাজিম উদ্দিন।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

 ‘অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে’ অনুষ্ঠানে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমাদের চারপাশের মেধাবীরা স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে ছোঁয়া সবার জন্য সহজ হয় না। আজকে আমাদের সঙ্গে এমন একজন স্বপ্নবাজ মানুষ আছেন, যিনি সম্প্রতি তার স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছেছেন। তিনি আমাদের অদম্য মেধাবীদের অন্যতম অহংকার। রায়হান আজাদ আপনার সাফল্যের এই সুন্দর সময়ে আপনাকে স্বাগত। প্রথমেই আপনার বর্তমান কর্মস্থল ও বিষয় সম্পর্কে জানতে চাই।

রায়হান আজাদ: ধন্যবাদ আপনাকে এবং প্রথম আলো ট্রাস্টকে আমাকে এমন একটি আয়োজনে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। আমি ২০২৫ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর ডক্টর মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে যোগদান করেছি। আমি সেখানে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কাজ করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই বিষয়েই আমি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছি, তাই নিজের প্রিয় বিষয়ে শিক্ষকতা করতে পারাটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

মাত্র চার-পাঁচ মাসের শিক্ষকতা জীবন। এই অল্প সময়ে একজন শিক্ষক হিসেবে আপনার অনুভূতি কেমন? শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের রসায়নটা যদি একটু বলতেন।

রায়হান আজাদ: সত্যি বলতে, এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আমি যা জানি, তা যখন কয়েকশ শিক্ষার্থীর মাঝে ছড়িয়ে দিই, তখন যে তৃপ্তি পাই—তা অতুলনীয়। শিক্ষকতা আমার কাছে কেবল পেশা নয়, এটি একটি নেশার মতো। আমার মনে পড়ে, মাধ্যমিক জীবনে আমি বন্ধুদের কঠিন বিষয়গুলো সহজ করে বুঝিয়ে দিতাম। যখন দেখতাম তারা বুঝতে পেরেছে, তখন আমার খুব ভালো লাগত। সেই ভালো লাগা থেকেই শিক্ষক হওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা তৈরি হয়েছিল। আজ যখন কলেজে ক্লাস নিই, শিক্ষার্থীরা যখন বলে, “স্যার, আপনি আমাদের প্রিয় শিক্ষক,” তখন খুব অবাক হই। তারা আমার উপস্থাপনা শৈলী এবং তাদের সাথে বন্ধুসুলভ মেশার ধরণটা খুব পছন্দ করে। শিক্ষার্থীদের এই ভালোবাসা আমাকে প্রতিদিন আরও ভালো শেখানোর প্রেরণা দেয়।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনি খুব অল্প সময়ে শিক্ষার্থীদের মন জয় করেছেন, এটি একজন শিক্ষকের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এবার একটু পেছনে ফিরি। আপনার বেড়ে ওঠার গল্প এবং সেই দুরন্ত শৈশবের কথা শুনতে চাই। রায়হান আজাদ কীভাবে আজকের এই অবস্থানে এলেন?

রায়হান আজাদ: আমার ছোটবেলা ছিল সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া গ্রামে। আমি অত্যন্ত সাধারণ, বলতে পারেন এক গ্রামীণ পরিবেশে বড় হয়েছি। আমার স্কুলে যাওয়ার গল্পটা একটু অন্যরকম। সাধারণত শিশুরা বাবা-মায়ের হাত ধরে স্কুলে যায়, কিন্তু আমি শীতের এক সকালে মাত্র ২০ টাকা নিয়ে একাই ধানগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম। প্রথম দিন শিক্ষকদের সামনে যাওয়ার সাহস করতে পারিনি, ফিরে এসেছিলাম। দ্বিতীয় দিন যখন গেলাম, এক ম্যাম আমাকে ডেকে নিলেন। তিনি যখন দেখলেন আমার সাথে কোনো অভিভাবক নেই, তখন তিনি নিজেই আমার অভিভাবকের জায়গায় স্বাক্ষর করে আমাকে ভর্তি করিয়েছিলেন। প্রাথমিকে শুরুতে আমি খুব একটা সিরিয়াস ছিলাম না, কিন্তু প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় যখন গণিতে ৯৯ নম্বর পাই, তখন আমার নিজের সামর্থ্য নিয়ে বিশ্বাস জন্মায়। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রোল ২ হওয়ার পর আমার ভেতর জেদ চেপেছিল যে আমাকে আরও ভালো করতে হবে। সেই থেকে শুরু, ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত আমি প্রতিবার প্রথম স্থান ধরে রেখেছিলাম।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

পরিবারে গাইড করার মতো কেউ না থাকলেও আপনার এই জেদটা সত্যিই প্রশংসনীয়। কিন্তু এই দীর্ঘ পথে বাধা তো নিশ্চয়ই ছিল?

রায়হান আজাদ: অনেক বাধা ছিল। আমি আমার বংশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া গ্র্যাজুয়েট। বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ বা দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। তাই আমি ক্লাসেই শিক্ষকদের কাছে সব পড়া বুঝে নিতাম। শিক্ষকরাও আমার এই আগ্রহ দেখে আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। আমি শুধু পড়াশোনায় নয়, সহশিক্ষা কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিলাম। ছবি আঁকায় উপজেলা পর্যায়ে বারবার প্রথম হয়েছি। এই যে মানুষের মনোযোগ পাওয়া, সবার ভালোবাসা পাওয়া—এটা আমার ভেতর এক ধরণের দায়িত্ববোধ তৈরি করেছিল। মনে হতো, সবার এই ভালোবাসার সম্মান আমাকে রাখতেই হবে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর জীবনের লড়াইটা কেমন ছিল? আমরা জানি, আপনি অনেক কঠিন সময় পার করেছেন।

রায়হান আজাদ: উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার জন্য যখন প্রথম ঢাকায় এলাম, তখন সবকিছু খুব কঠিন মনে হচ্ছিল। যান্ত্রিক এই শহরের সাথে মানিয়ে নেওয়া এবং পড়ার খরচ চালানো—দুটোই ছিল চ্যালেঞ্জ। আমার বড় ভাই তার সামর্থ্য অনুযায়ী আমাকে সাহায্য করতেন, কিন্তু এক সময় পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। সেই চরম সংকটের সময় ‘প্রথম আলো ট্রাস্ট’ আমার পাশে দাঁড়ায়। সাজিদুল আলম স্যারের মাধ্যমে আমি ‘অদম্য মেধাবী’ তহবিলের বৃত্তি পাই। এই সহযোগিতা না পেলে আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা হয়তো মাঝপথেই থেমে যেত। স্নাতক শেষ করার পর যখন চাকরির বাজারে ঢুকলাম, তখন শুরু হলো আরেক মানসিক যুদ্ধ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাইভায় তিনবার উত্তীর্ণ হতে না পেরে আমি খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, এত চেষ্টা করেও কেন হচ্ছে না?

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

সেই হতাশার সময়ে আপনি নিজেকে কীভাবে উজ্জীবিত রাখতেন? ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিটা কোথায় পেলেন?

রায়হান আজাদ: আমার জীবনের মূলমন্ত্র ছিল—‘হাল না ছাড়া’। আমি আমার ফেসবুক কভার এবং ফোনের স্ক্রিনে লিখে রাখতাম, “চলতে থাকা এবং হাল না ছাড়া”। আমি বিশ্বাস করতাম, যদি আমি থেমে না যাই, কোনো না কোনো পথ নিশ্চয়ই খুলে যাবে। ২০২০ সালে করোনাকালে আমি আমার বাবাকে হারাই। বাবা আমার সাফল্য দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তিনি সবসময় আমাকে নিয়ে গর্ব করতেন। আজ আমার মা বেঁচে আছেন, তাকে ঘিরেই আমার সব স্বপ্ন। আমি যখন এই কলেজের শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হলাম, প্রথম খবরটি মাকে দিয়েছিলাম। মায়ের সেই আনন্দাশ্রু আমার সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছিল।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

ভবিষ্যতে নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চান? আপনার স্বপ্নগুলো এখন কী নিয়ে?

রায়হান আজাদ: আমি একজন ‘আর্টিকুলেট’ এবং আদর্শ শিক্ষক হতে চাই। শিক্ষক হওয়া মানে কেবল বইয়ের জ্ঞান মুখস্থ করানো নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জীবনমুখী করতে শেখানো। আমি চাই আমার শিক্ষার্থীরা যেন আমাকে দেখে স্বপ্ন দেখতে শেখে। বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে একজন আধুনিক এবং নীতিবান শিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলাই আমার আগামীর লক্ষ্য। আমি বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষক তার আদর্শের মাধ্যমেই যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকেন।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

রায়হান, আপনার গল্প আমাদের সবার জন্য এক বড় শিক্ষা। প্রতিকূলতাকে জয় করে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, আপনি তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। আপনার আগামীর পথচলা সুন্দর হোক, আপনি হয়ে উঠুন হাজারো শিক্ষার্থীর আলোকবর্তিকা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

রায়হান আজাদ: আপনাকেও ধন্যবাদ। প্রথম আলো ট্রাস্টের এই ঋণ আমি কোনোদিন ভুলব না। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।