আমি অন্যদের মধ্যে স্বপ্ন দেখার ইচ্ছাটা তৈরি করতে চাই, বোঝাতে চাই, স্বপ্ন দেখলেই মনের আকাশটা বড় হয়ে ধরা দেয়— বর্ষা রানী।

সম্প্রতি নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিজের জীবনসংগ্রামের কথা বলেছেন বর্ষা। এবার অবশ্য বর্ষা একা আসেন নি। সঙ্গে তাঁর জীবনসঙ্গী নিতাই চন্দ্র রায়ও ছিলেন। নিতাই চন্দ্র রায় নিজেও পেশায় শিক্ষক। গুণভরি দ্বি-মুখী উচ্চবিদ্যালয়, ফুলছড়ি, গাইবান্ধায় সহকারী শিক্ষক (বাংলা) হিসেবে কর্মরত আছেন। ২০২১ সালের ২৮ জুন ভালোবেসে বর্ষা রানী ও নিতাই চন্দ্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ছায়ানটে নিতাই চন্দ্রের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, তাঁর স্ত্রীর স্বপ্ন পূরণের জন্য সকল সহযোগিতা তিনি হাসি মুখে করতে রাজি। তিনি সব সময় বর্ষার পাশে আছেন, থাকবেন। ‘বর্ষার স্বপ্ন এখন আর কেবল অর একার না, আমারও’— বললেন নিতাই চন্দ্র।

বর্ষার আজকের এই জীবনটা এতটাও সহজ ছিল না। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে বাবা-মা মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ে একসময় ঠিকই বুঝে ফেলেন, বই কিনে দেওয়ার সামর্থ্য ভ্যান চালক বাবা কিংবা অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার চালানো মায়ের পক্ষে সম্ভব না। সহপাঠীদের কাছ থকে বই এনে পড়েছেন, স্কুলে পরীক্ষার ফি মওকুফের জন্য আবেদন করেছেন। এসএসসি পরীক্ষার ভালো ফলাফল যখন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল, তখনই প্রথম আলোয় বর্ষাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো। পরে তিনি ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবী শিক্ষাবৃত্তির জন্য মনোনীত হন। উচ্চমাধ্যমিকে বর্ষা শুধু জানতেন যেভাবেই হোক, তাঁকে ভালো ফল করতে হবে। বর্ষা রানী ২০১২ সালে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবী শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে বর্ষা স্নাতক সম্পন্ন করেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

আমি আমার গ্রামের প্রথম সরকারি চাকরিজীবী। আমাকে দেখেই আমার পরিবার ও আশপাশের মানুষেরা জেনেছেন, মেয়ে হয়েও এতটা পড়াশোনা করা যায়, প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক হওয়া যায়— বর্ষা রানী।

বর্ষা তারাগঞ্জের যে গ্রামে জন্মেছিলেন, সে গ্রামের কেউ যখন উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেননি, তখন সে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তেমন একটি গ্রামের মেয়ে বর্ষা এখন লালমনিরহাট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। পাশাপাশি ৪১তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। বর্ষা বলেন, ‘আমি আমার পাড়া, আমার স্কুল, কলেজ এমনকি আমার গ্রামের প্রথম সরকারি চাকরিজীবী। আমাকে দেখেই আমার পরিবার ও আশপাশের মানুষেরা জেনেছেন, মেয়ে হয়েও এতটা পড়াশোনা করা যায়, প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক হওয়া যায়। এরপর আমি যখন মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক হলাম, তখন সবাই বুঝলেন, নিজের চেষ্টা থাকলে অনেক দূর যাওয়া যায়। আমি সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে চাই, যেন আমাকে দেখে আমার গ্রামের সবাই বুঝতে পারে, একটা মেয়ে কেবল সরকারি শিক্ষকই নয়, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজ করতে পারে। আমি অন্যদের মধ্যে স্বপ্ন দেখার ইচ্ছাটা তৈরি করতে চাই, বোঝাতে চাই, স্বপ্ন দেখলেই মনের আকাশটা বড় হয়ে ধরা দেয়।’