অদম্য মেধাবী

আত্মবিশ্বাস, চেষ্টা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে এগোলে সফলতা আসবেই—কানিজ ফাতেমা

প্রথম আলো ট্রাস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে’। এই আয়োজনে আমরা সেই অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে কথা বলি যিনি তার আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন সফল হয়েছেন, নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। এমনি একজন অদম্য মেধাবীকে নিয়ে গত ১৮ জুন ২০২৫, বিকেল ৫টায় আয়োজন করা হয় ‘অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে’অনলাইন অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের এ পর্বের অতিথি ছিলেন ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য তহবিল থেকে শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া চট্টগ্রামের পটিয়ার অসচ্ছল পরিবারের মেয়ে অদম্য মেধাবী কানিজ ফাতেমা। ছোটবেলা থেকেই দরিদ্রের সঙ্গে সংগ্রাম করছেন। আর্থিক সংকটের কারণে কলেজে পড়া নিয়ে ছিল অনিশ্চয়তা। কিন্তু কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছার কারণে হয়েছেন সফল। তিনি পটিয়া সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে সম্প্রতি স্নাতক (সম্মান) করেছেন। এখন স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন ও সরকারি চাকরি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। সাক্ষাৎকারটি অনুলিখন করেছেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. নাজিম উদ্দিন।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

কানিজ ফাতেমা কেমন আছেন?

কানিজ ফাতেমা: আলহামদুলিল্লাহ। আপনি ভালো আছেন?

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

ভালো আছি। প্রথমেই আপনার ছোটবেলা জেনে নিব। ছোটবেলা থেকে এখন গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করলেন—পুরো জানিটা কেমন ছিল? ছোটবেলায় কানিজের জীবন কেমন ছিল, ছোটবেলা থেকে কি স্বপ্ন দেখত, কি হতে চাইতো কানিজ?

কানিজ ফাতেমা: আসলে আমার প্রতিকূলতাটা শুরু হয়েছে যখন আব্বু মারা যান। তখন আমি সদ্য এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। এর আগে আসলে প্রতিকূলতা কি সেটা আমি তেমন বুঝতে পারিনি। মানে তখন তো আব্বু ছিল। কি করব, কি হতে হবে এসব নিয়ে তেমন একটা ভাবনা তেমন ছিল না। কিন্তু যখন এসএসসি দিলাম, এপ্রিলে শুরু হয়ে মার্চের শেষের দিকে শেষ হলো। আর এপ্রিলের ১ তারিখে সড়ক দুর্ঘটনায় আমার আব্বু মারা গেলেন। ওই সময় থেকেই আসলে আমার জার্নিটা শুরু। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় পরিবারের দায়িত্ব সম্পূর্ণটা আমার ওপর পরল। এতটুকু আসাটার পেছনে প্রথম আলো, ব্র্যাক ব্যাংক পাশে ছিল। প্রথম আলো যে সহায়তা করে আমি জানতাম না। আমাদের স্কুলের শফিকুল ইসলাম ও মুরাদ স্যারের মাধ্যমে আমি এটা জানতে পারি। পরে প্রথম আলোর সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক স্যার আমাকে নিয়ে প্রতিবেদন করেন এবং আমার বৃত্তির ব্যবস্থা হয়।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

এরপর এইচএসসিতে কলেজে ভর্তি হলেন। কলেজেও আপনি নিশ্চয়ই ভালো রেজাল্ট করেছেন এবং যার জন্য স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষাবৃত্তিটা পেলেন। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বা ঘুরে দাঁড়াতে আপনি কি নিয়ে পড়াশোনা করবেন বা সামনে কি করতে চান—ভেবেছেন কিছু?

কানিজ ফাতেমা: পরিবারের পাশে বলতে, আমাদের মতো স্টুডেন্টরা টিউশন ছাড়া অচল বলতে গেলে। এখন যেহেতু আমি কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাকাউন্টিং নিয়ে পড়ছি, শেষ করছি। এখন অ্যাকাউন্টিং সাবজেক্টগুলো পড়াতে পারি এবং অন্য ক্লাসেরও পড়াই সিক্স টু সেভেন। পড়াতে পড়াতে এখন শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আমরা অফলাইনে আপনার কাছ থেকে জানছিলাম যে, আপনি বিসিএস কর্মকর্তা হতে চান। এর জন্য আপনার প্রস্তুতি কেমন?

কানিজ ফাতেমা: আমি ক্লাস নাইনে উঠলাম। আব্বু সব সময় বলত যে, আমার মেয়েকে আমি বিসিএস করাব। কিন্তু তখন বিসিএসটা কি, কিভাবে হয়—এটা বুঝতাম না। কিভাবে হয় কি? আমি এইচএসসি শেষ করে অনার্স জীবনে পা রাখলাম, তখন আসলে বুঝতে পারছি বিসিএস কি। কলেজের অধ্যক্ষদের যখন দেখি, তখন খুব ভালো লাগে। তা ছাড়া বিসিএস কর্মকর্তা হওয়া অনেক সম্মানের। এরপর চিন্তা করলাম, আব্বু যেহেতু বলত দেখি চেষ্টা করে। চেষ্টা করে দেখি বাকিটা আল্লাহ ভরসা।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

স্নাতক শেষ করলেন। এখন বিসিএসের জন্য নিশ্চয়ই পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছেন। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা বা মাস্টার্স করার কোন পরিকল্পনা আছে কি?

কানিজ ফাতেমা: জি, পরিকল্পনা আছে। আজকে আমাদের মাস্টার্সে ভর্তির মেরিট লিস্ট দিয়েছে। যেহেতু আমার সবকিছু পটিয়া থেকে করেছি। শহরে তো আমাদের যাওয়া আসা সম্ভব না। সে জন্য আমি পটিয়া কলেজেই আবেদন করছি। আলহামদুলিল্লাহ মাস্টার্স মেরিট লিস্টে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে নাম আসছে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

অভিনন্দন আপনাকে। প্রথম অভিনন্দনটা তো আপনার স্নাতক শেষ করবার জন্য ছিল, এখনকার অভিনন্দনটা আপনি আপনার মাস্টার্সটা শুরু করতে যাচ্ছেন সেই জন্য। নিশ্চয়ই আপনি মাস্টার্সেও ভালো রেজাল্ট করেই শেষ করবেন।

 কানিজ ফাতেমা: অবশ্যই। আপনারা আমাদের পাশে থাকবেন। আমাদের পাশে থাকলে অবশ্যই আমরা পারব।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনি তো জীবনের একদম অল্প বয়স থেকেই জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছেন এবং খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আপনি আপনার অভিভাবককে হারিয়েছেন। সেই সময় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য মানসিক সাহসটা কিভাবে পেলেন, ধরে রাখলেন কিভাবে?

কানিজ ফাতেমা: আমার শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে একদম ছোটবেলা থেকেই আমার আম্মুর অবদানটা সবচেয়ে বেশি। আমার শৈশবটা কেটেছে আমার নানুর বাড়িতে। আমার নানু আমাকে অনেক হেল্প করেছে পড়ালেখা করতে। আমার আব্বু যাওয়ার পরে আম্মু আমাকে সব সময় সাহস দিয়েছেন। যখন আব্বু মারা যাওয়ার পর অনেক আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশীরা বলেছে মেয়েকে পড়িয়ে কি হবে। বিয়ে দিয়ে দাও। কিন্তু আমার মা বলেছে, যতই কষ্টই হোক মেয়েকে আমি পড়ালেখা করাব।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনি যে এখন স্নাতক শেষ করলেন। আপনার মা নিশ্চয়ই তাঁর ভালোলাগা প্রকাশ করেন, তাই না?

কানিজ ফাতেমা: জি, আমাদের গ্র্যাজুয়েশন শেষ হওয়ার কথা ছিল আরও আগে কিন্তু করোনার লকডাউন পড়ে যাওয়ায় দুই বছর পিছিয়ে গেছে। আম্মু শুধু জানতে চাইতো, কখন আমার গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন হবে, সবার সামনে বলতে পারবে মেয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেছে। আম্মু অনেক খুশি। মাস্টার্সটা শেষ করতে পারলে আরও খুশি হবেন তিনি। এরপরে যদি কোন একটা জব সেক্টরে ঢুকতে পারি তাহলে আমার আম্মুর স্বপ্নটা আরও পূরণ হবে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

নিশ্চয়ই। আমাদের সে একই দোয়া থাকবে। আপনার মায়ের স্বপ্ন পূরণ হোক, আপনার বাবার স্বপ্ন পূরণ হোক। জীবনের এই যে খারাপ সময়গুলো আসে, তখন আমরা ভেঙে যাই। মনে হয়, আর সামনে বোধ হয় যাওয়া যাবে না। এই খারাপ সময়টাতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কেমন মনোবল দরকার। এখন যারা অদম্য আছে, তাদের জন্য যদি আপনার কোন পরামর্শ থাকে।

কানিজ ফাতেমা: প্রথমত, জীবনের যে কোন পরিস্থিতিতে খারাপ সময় আসবে। কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না। স্বপ্ন দেখতে হবে। যত দূর চোখ যায়, তত দূর অবধি স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নিজেকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে। নিজের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। আমি এই জায়গাটা ধরে রাখতে পারব। এই জায়গাটাতে আমাকে যেতেই হবে। আমাদের পরিবার, আমাদের পাশে যারা দাঁড়ায় যেমন প্রথম আলো, তাদেরও স্বপ্ন থাকে। তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য অবশ্যই আমাদের সে চেষ্টাটা করতে হবে। পরিশ্রমটা করতে হবে। যদি পরিশ্রম না করে বসে থাকি, তাহলে আমরা সফলতার মুখ দেখব না। কোন পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়া চলবে না। ভেঙে পড়লেই স্বপ্নটাও ভেঙে যাবে। আর সামনে যাওয়ার পথ খুঁজে পাব না আমরা।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

অনেক ধন্যবাদ আপনাকে সময় দেওয়ার জন্য। আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।

কানিজ ফাতেমা: আমার জন্য দোয়া করবেন। আপনাদেরকেও ধন্যবাদ ।