সাক্ষাৎকার

অদম্য সামাউলের স্বপ্নজয়ের গল্প

প্রথম আলো ট্রাস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে’। এই আয়োজনে আমরা সেই অদম্য মেধাবীদের সঙ্গে কথা বলি যিনি তাঁর আর্থিক, সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন সফল হয়েছেন, নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। এমনই একজন অদম্য মেধাবীকে নিয়ে গত ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সোমবার, বেলা ৩টায় আয়োজন করা হয় এই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের এ পর্বের অতিথি ছিলেন প্ল্যানেটারি হেলথ অ্যাকাডেমিয়া-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য তহবিল থেকে শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া গ্রামে অদম্য মেধাবী সামাউল ইসলাম। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। অনুষ্ঠানটির মধ্য দিয়ে তার দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার গল্পটি ওঠে এসেছে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। সাক্ষাৎকারটি অনুলিখন করেছেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. নাজিম উদ্দিন।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

অদম্য মেধাবী অনুষ্ঠানে আপনাকে স্বাগতম। আজ আমাদের সঙ্গে আছেন সামাউল ইসলাম, যিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। সামাউল, আপনার শৈশবের দিনগুলো কেমন ছিল এবং এই যে আজ ডাক্তার হওয়ার পথে হাঁটছেন, এই স্বপ্নটা কবে থেকে দানা বাঁধল?

সামাউল ইসলাম: ধন্যবাদ আপু। আসলে আমার ছোটবেলাটা অন্য সাধারণ বাচ্চাদের মতোই ছিল। পড়াশোনার চেয়ে খেলাধুলা নিয়েই বেশি মেতে থাকতাম। যদিও ক্লাস ফাইভ ও অস্টম শেণিতে আমি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলাম, কিন্তু তখনো জানতাম না জীবনের লক্ষ্য কী। নবম শ্রেণিতে যখন পড়ি, তখন করোনা মহামারি শুরু হয়। প্রায় দেড় বছর স্কুল বন্ধ ছিল। সেই সময়টায় আমি আমার বাবার সঙ্গে সবজির ব্যবসা করতাম, বাবাকে কাজে সাহায্য করতাম।

ডাক্তারি পড়ার স্বপ্নটা আসলে একটা দুঃখজনক ঘটনা থেকে আসা। করোনাকালীন সময়ে আমার দাদি ব্রেন স্ট্রোক করে মারা যান। আমরা বুঝতেই পারিনি যে তাঁর স্ট্রোক হয়েছে। সেই কষ্ট থেকেই মনে হলো যে আমার ডাক্তারি পড়া উচিত। এ ছাড়া আমি ভাবতাম, ইঞ্জিনিয়ার হলে হয়তো নিজের জন্য কিছু করতে পারব, কিন্তু ডাক্তার হলে মানুষ আমার বাবা-মায়ের কাছে আসবে, সমাজে তাঁদের সম্মান বাড়বে। এই ভাবনা থেকেই আমার লক্ষ্য স্থির হয়।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

দেড় বছর পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার পর আবার ফিরে আসা তো নিশ্চয়ই খুব কঠিন ছিল। আপনি সেই সময়টা কীভাবে সামলেছিলেন?

সামাউল ইসলাম: সত্যি বলতে, যখন করোনা শেষে আবার পড়া শুরু করলাম, দেখলাম আমি অন্যদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছি। তখন আমি নিজের ওপর অনেক কঠোর পরিশ্রম চাপিয়ে দিই। এমন দিন গেছে যে আমি সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টার মধ্যে ১০ ঘণ্টাই টানা পড়তাম। রাতেও অল্প ঘুমানোর পর আবার পড়া শুরু করতাম। এই ধারাবাহিকতা আমি একদম মেডিকেল অ্যাডমিশন পরীক্ষার আগের দিন পর্যন্ত বজায় রেখেছিলাম। এই পরিশ্রমের ফলেই এসএসসিতে আমি আমাদের স্কুলে প্রথম হই।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনার আত্মবিশ্বাস তো দারুণ! আপনি নাকি পরীক্ষা দিয়েই বুঝতে পারেন কত নম্বর পাবেন?

সামাউল ইসলাম: জি, অনেকে আমাকে এ জন্য 'ওভার কনফিডেন্ট' বলে, কিন্তু আমার কাছে এটা পরিশ্রমের ফল। আমি এসএসসিতে কত পাব বা মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় কত পাব, তার একটা ছক মনে মনে এঁকে নিতাম। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় আমি আশা করেছিলাম ৮৫ পাব, পেয়েছিলাম ৮৪.৫। এখনো মেডিকেলের কার্ড বা টার্ম পরীক্ষা দিয়ে আমি বুঝতে পারি কত নম্বর আসবে, যা প্রায় শতভাগ মিলে যায়। আমার মূলমন্ত্র হলো—  'পারব মানে পারবই, একজন যদি পারে তবে সেটা আমি কেন পারব না? '।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনি তো একজন কার্ডিওলজিস্ট হতে চান। এই বিশেষ বিভাগটি বেছে নেওয়ার কারণ কী?

সামাউল ইসলাম: হৃদ্‌রোগ বা কার্ডিওলজি আমাকে শুরু থেকেই টানে। তবে সত্যি বলতে, মেডিকেল ক্যারিয়ারে সময়ের সাথে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়। কোন দিকে গেলে মানুষের সেবা বেশি করা যাবে এবং ভবিষ্যৎ সচ্ছল হবে, সেসব মিলিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব। তবে এখন পর্যন্ত কার্ডিওলজিস্ট হওয়ার স্বপ্নটাই বড়।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আমাদের সমাজে অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা কঠোর পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না এবং হতাশ হয়ে পড়ে। তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

সামাউল ইসলাম: আমি বলব, কখনো নেতিবাচক চিন্তা মাথায় আনা যাবে না। অনেকে এক সাথে দুই-তিনটা লক্ষ্য নিয়ে এগোতে চায়, যেমন ভার্সিটি আর মেডিকেল এক সাথে রাখা। এতে ফোকাস নষ্ট হয়। শুরু থেকেই গোল বা লক্ষ্য নির্দিষ্ট করতে হবে। আর পড়াশোনার গ্রাফটা হতে হবে একদম সমান্তরাল। একদিন ১৫ ঘণ্টা আর পরের দিন ২ ঘণ্টা পড়লে হবে না; প্রতিদিন নিয়ম করে ১০ ঘণ্টাই পড়তে হবে। নিজের পরিশ্রম আর আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখলে সফলতা আসবেই।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনি প্রথম আলো ট্রাস্টের মাধ্যমে 'প্লানেটারি হেলথ একাডেমি ট্রাস্ট' থেকে শিক্ষাবৃত্তি পাচ্ছেন। এই সংগঠনটি আপনার জন্য কতটা সহায়ক হচ্ছে?

সামাউল ইসলাম: পিএইচএ-র প্রতি আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে ডা. তাসবিরুল ইসলাম স্যারের মতো বড় মাপের মানুষদের সঙ্গে এই বয়সে কথা বলা বা তাঁদের গাইডেন্স পাওয়া আমার জন্য কল্পনাতীত ছিল। তাঁরা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। তাঁদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারছি কীভাবে আন্তর্জাতিক মানের ক্যারিয়ার গড়া যায় এবং দেশের সেবায় কাজ করা যায়। এটি আমার মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল সুযোগ।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

সামাউল, আপনার এই অদম্য স্পৃহা আর আত্মবিশ্বাস আমাদের সত্যিই অনুপ্রাণিত করে। আপনার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য পূরণ হোক এবং আপনি একজন মানবিক চিকিৎসক হয়ে উঠুন—এই শুভকামনা রইল।

সামাউল ইসলাম: আপনাদেরও অনেক ধন্যবাদ আমাকে এখানে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। আপনাদের মাধ্যমে আমি সবার কাছে দোয়া চাই যেন আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি এবং মানুষের সেবা করতে পারি।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনার এই অদম্য স্পৃহা সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। শুভকামনা রইল আপনার জন্য।

সামাউল ইসলাম: আপনাদেরও অনেক ধন্যবাদ। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন যেন আমি একজন মানবিক চিকিৎসক হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করতে পারি।