সাক্ষাৎকার

নিজেকে একজন সফল সায়েন্টিস্ট হিসেবে দেখতে চাই—রিংকি ভৌমিক

প্রথম আলো ট্রাস্টের একটি নিয়মিত আয়োজন হলো ‘অদ্বিতীয়ার গল্প’। এ আয়োজনে আইডিএলসি-প্রথম আলো ট্রাস্টের ‘অদ্বিতীয়া’ শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া একজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনলাইন এই আয়োজনে ২০২৫ সালের ০১ জানুয়ারি বেলা ৩টায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ২০২১ সালে এই বৃত্তি পাওয়া রিংকি ভৌমিককে। তিনি তাঁর পরিবারের প্রথম কোনো সদস্য যিনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছেন। তিনি চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) বায়োলজিক্যাল সায়েন্স বিভাগের স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পরিবারের প্রথম নারী হিসেবে স্নাতক পর্যায়ে যাওয়া এবং তাঁর স্বপ্নের কথাগুলো ওঠে এসেছে এ অনুষ্ঠানে। আয়োজনটি একযোগে সম্প্রচারিত হয় প্রথম আলো ও প্রথম আলো ট্রাস্টের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে। সভাটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। প্রশ্ন উত্তর আলোকে অনুষ্ঠানের চুম্বক অংশ নিয়ে লিখেছেন মো. নাজিম উদ্দিন।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

রিংকি, স্বাগত। নতুন বছরের শুভেচ্ছা। কেমন আছেন?

রিংকি ভৌমিক: ধন্যবাদ আপু। আমি ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

ভালো আছি রিংকি, আপনার বাবা আপনাকে সব সময় সাহস যুগিয়ে গেছেন, তাই আপনি পিছপা হননি। বাবার অনুপ্রেরণা আপনার ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছিল?

রিংকি ভৌমিক: বাবা সব সময় বলতেন যে, হোক বা না হোক একবার চেষ্টা করবে। চেষ্টা করতে করতে এমন মনে হতো যে, আসলে চেষ্টা করলে সবকিছু পাওয়া যায়। ওইটা বাবার শিখিয়ে দেওয়া আর কি। বাবা-মায়েরা আমাদের সঙ্গে সব সময় এভাবেই সঙ্গী হয়ে থাকেন।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

নিঃসন্দেহে আপনি একজন ভাগ্যবতী মেয়ে যে আপনি বন্ধুর মতো বাবা পেয়েছেন, যিনি আপনাকে কখনো হারতে শেখায়নি। আপনার বাবার জন্য অনেক দোয়া থাকবে আমাদের পক্ষ থেকে এবং আপনার জন্য অবশ্যই শুভকামনা থাকবে। রিংকি, খুব সংক্ষেপে একটু জেনে নিতে চাই, আপনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের খবরটা পেলেন কি করে? ভর্তির গল্পটাও একটু শুনতে চাই।

রিংকি ভৌমিক: হ্যাঁ, এই সূত্রটা আমার বাবাই আমার কাছে এনে দিয়েছেন। বাবা আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রামে কাজ করতেন। ওইখানের যে ম্যানেজার, ওনার কাছে বাবা আমার বিষয়ে বলত। বাবা সব সময় আমাকে নিয়ে গর্ববোধ করত। ম্যানেজারের সঙ্গে বাবা একটু একটু করে কথাবার্তা বলতেন। তিনি বলতেন যে, আমার মেয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী, ওরে আমি সায়েন্স বিভাগ নিয়ে পড়াচ্ছি। ছিলাম বাবা কথা লুকানোটা পছন্দ করত না, শেয়ার করত খুব, ওপেনলি কথাবার্তা বলত। বাবার কাছে শুনে ওই ম্যানেজার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের খবর দেন এবং আবেদন করতে বলেন। ওনার জন্যই আজ এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি। আমি উনাকে এখনো দেখি নাই। আমি ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর ট্রান্সফার হয়ে গেছেন। তবে আমি ওনার জন্য অনেক প্রার্থনা করি, ভগবান তাঁকে ভালো রাখুক।

মূলত ওনার মাধ্যমে বাবা জানছে। যেদিন জানছে, ওই দিনেই মনে হয় লাস্ট তারিখ বা দুই একদিনের মধ্যে লাস্ট ডেট ছিল। পরে আবেদন করি। আমরা যারা সিলেটের ছিলাম তারা মিন্টু দাদা, বিজয় দাদা ও প্রাণেশ দাদার সহযোগিতায় ফরম তোলা হয়। তারপরে অল্প কিছু প্রস্তুতির মাধ্যমেই পরীক্ষায় অংশ নিই। ফল প্রকাশ হলে দেখি আমার হয়েছে। তখন বাবা অনেক খুশি হয়েছিল।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আমরা অন্যান্য শিক্ষার্থীদের কাছে শুনি যে, প্রথমেই সবাই একটা ধাক্কা খায়—রুমমেটরা ফরেনার থাকে, টিচারদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে হয়। ওখানে বইয়ের পড়াশোনা ইংরেজি, প্রফেসররা ফরেনারস। এর বাইরে প্রোগ্রাম, টার্ম পেপার, অ্যাসাইনমেন্ট, মিড টার্ম, ফাইনাল—এইগুলো তো আছেই। এমতাবস্থায় আপনাকে কি কখনো হিমশিম খেতে হয়েছে? কখনো কি মনে হয়েছে যে, কোথায় ভর্তি হলাম আর বোধয় পারছি না?

রিংকি ভৌমিক: বাবা সব সময় বলতেন যে, `ওখানে তোর নিজের টেককেয়ার নিজেকেই করা লাগবে, ওখানে কেউ থাকবে না। সুতরাং ওইভাবে মেন্টালি প্রস্তুতি নিয়ে থাকবি। ‘আমার প্রথমে হিমশিম খেয়েছি বলতে—আমি ঘরকুনো লোক। ঘরে থাকতে আমার পছন্দ লাগত। অনেকে বলত যে, তুই বেড়াইতে যাস না কেন, মামাবাড়ি তো যেতে পারিস। কিন্তু আমি বাড়িতেই থাকতাম। এ জন্য বাবা মাঝে মধ্যে টেনশন করত যে, যে মেয়ে পিসিমার বাড়িতে, মামার বাড়িতে যাইতে পছন্দ করত না, ওই মেয়েটা এত দূরে আমাদের ছেড়ে কিভাবে থাকবে?

প্রথমে কষ্ট হইতো আমার। মিস করতাম অনেক বাবা-মা, ফ্যামিলি সবাইকে। তবে বাবা কল দিত, দিনে দুটো-তিনটা এ রকম কল দিয়ে জিজ্ঞেস করত। বাবাকে আমি ছোট ছোট বিষয়গুলো শেয়ার করতাম। আমি একটু গোছানো থাকতে পছন্দ করি। কিন্তু আমার রুমমেটগুলো একটু অগোছালো ছিল। কেউ নামাজ পড়ত, তখন আমি আমার ছবিগুলো একটু ঢেকে রাখতাম। আবার আমি যখন পূজো করতাম তখন ওরা সাইলেন্ট থাকত। এভাবে আমরা একে অন্যের হয়ে থাকতাম। বাবা বলত, 'বাইরের মানুষ, আসলে সবাইতো বাবা-মা ছাড়া ওইখানে। তোরা যখন নিজেদের একটা ফ্যামিলি বানাই নিবি, তখন বিষয়গুলা ইজি হবে। নিজে থেকে কিছু হয় না, নিজেকে বানাই নিতে হয়।' বাবার এই সাপোর্টগুলা পেয়ে অনেক সহজ হয়েছে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনার বাবার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমরাও আপনার বাবার মতো বলতে চাই যে, আপনি কখনো হারবেন না। আপনি জীবনের সকল পরিস্থিতি, সকল কঠিন পরিস্থিতি উতরে সফল হন—এই শুভকামনা আমাদের থাকবে। শেষ প্রশ্নটা করে বিদায় নিব। আপনি ভবিষ্যৎ স্বপ্ন কি? ক্যারিয়ারের জন কী স্বপ্ন দেখেন?

রিংকি ভৌমিক: আমার বাবা আলসার ও অন্যান্য কিছু সমস্যা ছিল। শারীরিক এই সমস্যার জন্য বাবাকে আমরা হারাই। ওই সমস্যাগুলো...এখন আমি বুঝতে পারি যে, এখনকার মতো ওই সময়টাতে জানতাম, আরও কিছু স্টেপ নিতে পারতাম, হয়তো বাবাকে আমরা আরও কিছুদিন আমাদের সঙ্গে পাইতাম। এটলিস্ট আমার গ্র্যাজুয়েশনের যে টুপিটা, আমি ওইটা বাবাকে পড়াতে পারতাম। এখন একটু রিগ্রেট ফিল হয় ওইগুলা মনে পড়লে, দেখলে।

ওভারঅল যদি আমি বলি, আমার লাইফের এখন একটা টার্গেট হয়ে গেছে যে, আমি নিজেকে একজন সফল সায়েন্টিস্ট হিসেবে দেখতে চাই। আর অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে চাই। এটলিস্ট সেমিনার, ক্লিনিক, বিভিন্ন সংগঠন, অর্গানাইজেশন যতগুলো আছে আমি সবগুলোর সঙ্গে একটু যুক্ত থেকে এটলিস্ট চা-বাগানের মানুষের জন্য কিছু একটা করতে চাই।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আপনি ভালো থাকুন এবং আপনার কমিউনিটিকে কন্ট্রিবিউট করবার আপনার যে স্বপ্ন, সে স্বপ্নটা পূরণ হোক। আপনি সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন সেই কামনায় আজকে শেষ করছি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য।

রিংকি ভৌমিক: আপনাকে ধন্যবাদ।