সাক্ষাৎকার

আলো ছড়ানো এক ‘অদ্বিতীয়া’ সিনথিয়ার গল্প

প্রথম আলো ট্রাস্টের একটি নিয়মিত আয়োজন হলো ‘অদ্বিতীয়ার গল্প’। এ আয়োজনে আইডিএলসি-প্রথম আলো ট্রাস্টের ‘অদ্বিতীয়া’ শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া একজনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনলাইন এই আয়োজনে ২০২৬ সালের ৩১ মে বিকেল ৫টায় বিশেষ পর্বে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ২০১২ সালে এই বৃত্তি পাওয়া সিনথিয়া খন্দকার উর্মিকে। যাঁর জীবনের গল্প শুধুই এক পথচলার গল্প নয়; বরং সেটি প্রতিকূলতাকে জয় করে সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার এক অনন্য অনুপ্রেরণা। ফ্রান্সে বসবাসরত সিনথিয়া একজন ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনালস এবং সাবেক ইউরোপিয়ান প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দেশ বিদেশের নানা বিষয়ে আলোচনা হলো এই অনুষ্ঠানে। আয়োজনটি একযোগে সম্প্রচারিত হয় প্রথম আলো ও প্রথম আলো ট্রাস্টের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে। সভাটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। প্রশ্ন উত্তর আলোকে অনুষ্ঠানের চুম্বক অংশ নিয়ে লিখেছেন মো. নাজিম উদ্দিন।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

সিনথিয়া, আমাদের আয়োজনে আপনাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও স্বাগত। কেমন আছেন আপনি?

সিনথিয়া খন্দকার: ধন্যবাদ আপু। আপনাকে এবং প্রথম আলো ট্রাস্টের দর্শক-শ্রোতাদের জানাচ্ছি আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা। আমি আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভালো আছি।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

 এবার তো দেশে বেশ লম্বা একটা সফর হলো। কত দিনের জন্য আসা হলো এবং সময়টা কেমন কাটল?

সিনথিয়া খন্দকার: হ্যাঁ আপু, এবার প্রায় চার মাসের মতো দেশে থাকা হলো। আসলে আম্মুর একটু দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ছিল, আর তার সঙ্গে নিজেরও কিছু কাজ—সব মিলিয়ে একটু লম্বা সময় পরিবারকে দেওয়া সম্ভব হলো।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আপনার আজকের যে সাফল্য, তার পেছনের শুরুর গল্পটা কিন্তু বেশ রোমাঞ্চকর। আমাদের দর্শকেরা এবং আমরা সবাই বিস্তারিতভাবে জানতে চাই—ঢাকার সাধারণ একটি পরিবারে বেড়ে ওঠা মেয়েটি প্রথমে কীভাবে চট্টগ্রামে পড়তে গেল, আর চট্টগ্রাম থেকে শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের মতো দেশে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিল?

সিনথিয়া খন্দকার: গল্পটা সত্যিই অনেক দীর্ঘ এবং আমার স্মৃতির পাতায় বেশ রঙিন। আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা পুরোটাই ঢাকায়। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত আমি ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা করেছি। তবে ছোটবেলা থেকেই আমার ভেতরে একটি সুপ্ত ইচ্ছে বা স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল—আমি গতানুগতিক বা চেনা কোনো পরিবেশে পড়াশোনা করব না, বরং এমন একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশে পড়াশোনা করব যেখানে বিশ্বমঞ্চের উন্মুক্ত হাওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়।

কিন্তু বাস্তবতা তো সব সময় সহজ ছিল না। আমাদের পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত ছিল। বাবার একার উপার্জনে আমাকে বিদেশে পাঠাব বা দামি কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পড়াব, সেই সুযোগ আমাদের ছিল না। তাই উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় থেকেই আমি নিয়মিত খবর রাখতাম যে কীভাবে এবং কোথায় বৃত্তির সুযোগ পাওয়া যায়। এখনকার মতো তো তখন তথ্যপ্রযুক্তি বা ইন্টারনেটের এত ছড়াছড়ি ছিল না। তাই তথ্য পাওয়ার মূল মাধ্যম ছিল দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় সংবাদপত্রগুলো। আমি নিয়মিত দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, যুগান্তরের মতো পত্রিকাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। সংবাদপত্রগুলোর বিভিন্ন কলাম ও শিক্ষাবিষয়ক বিজ্ঞাপন ঘেঁটে জানতে পারলাম চট্টগ্রামে ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন’ (এইউডব্লিউ) নামে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানলেও ভর্তিপ্রক্রিয়া কেমন বা স্কলারশিপ কীভাবে পাব—তা স্পষ্ট ছিল না। ২০১১ সালের শেষের দিকে আমি প্রথম জানতে পারি যে প্রথম আলো ট্রাস্ট এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘অদ্বিতীয়া’ নামে একটি বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করছে। এটি জানার পর আমার মনে হলো, হয়তো আমার স্বপ্নটা আর অসম্ভব বা অবাস্তব নয়। মন থেকে একটা তাগিদ অনুভব করলাম—আমাকে চেষ্টা করে দেখতেই হবে। অনলাইনে ওয়েবসাইট ঘেঁটে সব তথ্য নিলাম, আবেদন ফরম পূরণ করলাম এবং ভর্তি পরীক্ষায় বসলাম। কয়েক ধাপের কঠিন ভর্তি পরীক্ষা ও ভাইভা শেষে আমি সুযোগ পেয়ে গেলাম। আর এটিই ছিল আমার জীবনের প্রথম কোনো অর্জন, যার জন্য আমাকে প্রথমবারের মতো পরিবার ও ঢাকার ছায়া ছেড়ে চট্টগ্রামে পাড়ি জমাতে হয়েছিল।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

১৫ বছর আগে অর্থাৎ ২০১১-১২ সালের দিকে যখন একজন ১৮ বছরের তরুণী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেলে পড়ার ইচ্ছা ছেড়ে চট্টগ্রামের কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পড়তে যায়, তখন চারপাশের সমাজ ও আত্মীয়স্বজন নিশ্চয়ই খুব সহজে বিষয়টিকে মেনে নেয়নি। পারিপার্শ্বিক সেই মানসিক চাপগুলো কীভাবে সামলেছিলেন?

সিনথিয়া খন্দকার: আপনি খুব যথার্থ কথা বলেছেন। আজ থেকে ১৫ বছর আগে আমাদের দেশে এই আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা খুবই স্পষ্ট ছিল না। মানুষ সাধারণত চেনা পথের বাইরে হাঁটতে ভয় পায়, যা খুব স্বাভাবিক।

আমি স্কুলে এবং কলেজে পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিলাম। এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফলাফল থাকায় পরিবারের এবং নিকটাত্মীয়দের প্রবল ইচ্ছে ছিল আমি মেডিকেলে পড়ব, একজন ডাক্তার হব। কয়েক বছর পর্যন্ত আমার নিজেরও ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু মনের গভীরে যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করার একটা বড় স্বপ্ন পুষে রেখেছিলাম, সেই টানটা ছিল মেডিকেলের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।

আমি যখন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, তখন প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজনদের বেশির ভাগই সন্দিহান ছিলেন। অনেকেই বাবাকে বলেছিলেন, ‘এত ভালো রেজাল্ট থাকা সত্ত্বেও কেন মেয়েকে ঢাকার বাইরে অচেনা কোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে পাঠাচ্ছ?’ কিন্তু এই জায়গায় আমার বাবা-মা ছিলেন আমার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। তারা আমার ওপর শতভাগ ভরসা রেখেছিলেন।

আমি আমার মা-বাবাকে বুঝিয়েছিলাম, ‘আমি যদি সেখানে যাই, আমি নিশ্চিত ভালো কিছু করতে পারব। আর যা-ই হোক না কেন, আমি জীবনে সুখী হব, কারণ আমি যা চাই তা-ই করার সুযোগ পাচ্ছি।’ চারপাশের মানুষের মনে আমার ওপর কোনো আস্থা না থাকলেও, নিজের স্বপ্ন ও ক্ষমতার ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। আজ যখন ফিরে তাকাই, মনে হয় নিজের প্রতি সেই বিশ্বাসটুকুই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মূলধন ছিল।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

চমৎকার! এবার আসি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গল্পে। চট্টগ্রামে এইউডব্লিউ-তে পড়ার কোন সময়ে এবং কীভাবে ফ্রান্সে যাওয়ার সুযোগটি তৈরি হলো?

সিনথিয়া খন্দকার: এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) পরিবেশটাই ছিল বিশ্বমানের। শিক্ষক থেকে শুরু করে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ সহপাঠী ও রুমমেট ছিলেন বিভিন্ন দেশের নাগরিক। ক্লাস হতো সম্পূর্ণ ইংরেজিতে। প্রথম বর্ষে (২০১২ সালে) ক্লাস শুরু করার পর থেকেই দেখতাম যে আমাদের সিনিয়র আপুরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেমিস্টার এক্সচেঞ্জ বা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছেন।

ছোটবেলায় আমি ফরাসি রাজধানী প্যারিসকে নিয়ে লেখা একটি রোমাঞ্চকর গল্প পড়েছিলাম। সেই থেকে প্যারিস শহরটির প্রতি আমার আলাদা একটা ভালোলাগা বা ঘোরের মতো তৈরি হয়েছিল। আমার মাথায় সব সময় একটা 'ম্যানিফেস্টেশন' কাজ করত—জীবনে যদি কখনো সুযোগ আসে, তবে আমি প্যারিসে যাবই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টারের শেষের দিকে আমি নোটিশ বোর্ডে লিফলেট টাঙানো দেখলাম—ফ্রান্সের বিখ্যাত সিয়নসপো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একটি 'স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম'-এর সুযোগ রয়েছে। যদিও সুযোগটি ছিল তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য, কিন্তু আমি প্রথম বর্ষেই লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলি। প্রথম দুই সেমিস্টারে আমাদের বিভিন্ন বিষয় বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকত। আমি দেখলাম বিজ্ঞানের চেয়েও পলিটিক্যাল সায়েন্স বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়টির প্রতি আমার ঝোঁক অনেক বেশি। আর বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক অধ্যয়নের জন্য সিয়নসপো বিশ্ববিদ্যালয়টি র‍্যাঙ্কিংয়ে ১ নম্বরে অবস্থান করছে।

আমি মন স্থির করে ফেললাম যে যেকোনো মূল্যে আমাকে সিয়নসপোর এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে যেতেই হবে। প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর মধ্যে কয়েক ধাপের লিখিত পরীক্ষা, একাডেমিক সিজিপিএ এবং এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি যাচাই-বাছাই করা হয়। এরপর আমাদের প্রোফাইল ফ্রান্সে পাঠানো হয়। তারা চূড়ান্তভাবে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র দুজনকে নির্বাচন করে, এবং সৌভাগ্যবশত আমি তাঁদের একজন ছিলাম। আমি আড়াই বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব মূল কোর্স ক্রেডিট শেষ করে তৃতীয় বর্ষে এক বছরের জন্য ফ্রান্সে পাড়ি জমাই।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

ঢাকা থেকে সোজা ফ্রান্সে গিয়ে সম্পূর্ণ অচেনা একটি ভাষা ও সংস্কৃতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া কতটা কঠিন ছিল? বিশেষ করে ফরাসি ভাষা আপনি আয়ত্ত করলেন কীভাবে?

সিনথিয়া খন্দকার: সত্যি বলতে আপু, প্রথম কয়েকটা মাস আমার জন্য ছিল চরম সংগ্রামের। বাংলাদেশ থেকে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে যখন প্যারিসে নামলাম, বুঝলাম যে সেখানে সাধারণ মানুষের বেশির ভাগই ইংরেজি বোঝেন না বা বলতে চান না। আমি তখন ফরাসি ভাষার সাধারণ ‘হাই-হ্যালো’ টুকুও ঠিকঠাক জানতাম না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ফ্রেঞ্চ ভাষার কোর্স ছিল, কিন্তু দৈনন্দিন সারভাইভালের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। ভাষা শেখার জন্য আমি কিছু অভিনব কৌশল বেছে নিলাম। প্রথমত, স্থানীয় কিছু ফরাসি বন্ধু তৈরি করি। তারা আমাকে ফরাসি ভাষার শিশুদের কার্টুন ও অ্যানিমেশন দেখার পরামর্শ দিল। জটিল বা কঠিন শব্দ না বুঝে আমি শিশুদের দেখার মতো ফরাসি কার্টুন দেখা শুরু করলাম। প্রথমে হয়তো ৫০ ভাগ বুঝতাম, বাকি ৫০ ভাগ বুঝতামই না; কিন্তু কান তৈরি করার জন্য একটানা শুনে যেতাম।

দ্বিতীয়ত, গ্রোসারি বা কেনাকাটা করতে বাজারে যেতাম। সাধারণ মানুষ যেখানে আধঘণ্টায় কেনাকাটা শেষ করে, আমি বাজারে দেড়-দুই ঘণ্টা সময় কাটাতাম। বিভিন্ন শাকসবজি, ফলমূল বা নিত্যপণ্যের গায়ের ফরাসি নামগুলো মুখস্থ করতাম।

প্রথম ৩-৪ মাস এমনও হয়েছে যে ভাষা না বোঝার কারণে বাসের ভুল টিকিট কেটে গোলকধাঁধায় পড়ে গেছি, পথ হারিয়ে এক জায়গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটেছি। রাস্তার মানুষের কাছে যে সাহায্য চাইব, সেই ভাষাটুকু প্রকাশের মতো ক্ষমতা আমার ছিল না। অনেকে খুব ধৈর্য নিয়ে আমাকে সাহায্য করেছে, আবার অনেকে বিরক্ত হয়ে মুখের ওপর চলেও গেছে। নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হলে হয়তো কখনো একা একা কেঁদেছি, কিন্তু আবার পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করে বলেছি—‘ওরা তো আমাকে চেনে না, আমি ওদের ভাষা জানি না তাই অধৈর্য হচ্ছে। তাতে কী? আমাকে তো শিখতেই হবে।’

কাজের পরিবেশে ফ্রেঞ্চ শেখার গতি আরও বাড়াতে আমি ছোটখাটো পার্ট-টাইম স্টুডেন্ট জব করা শুরু করলাম। বইয়ের ভাষার চেয়ে মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যে চলতি ফ্রেঞ্চ ব্যবহার করে, কাজের জায়গায় কান খোলা রেখে রেখে আমি সেগুলো শিখতে থাকি। কঠোর অধ্যবসায় ও চেষ্টায় এক বছরের মাথায় আমি ফরাসি ভাষায় সাবলীল হয়ে উঠি এবং সিয়নসপোর মতো নামকরা প্রতিষ্ঠানে মাস্টার্স করার মতো আত্মবিশ্বাস অর্জন করি। ২০১৭ সালে আমি সফলভাবে সিয়নসপো থেকে মাস্টার্সের অ্যাডমিশন লেটার পাই।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর একজন ডেভেলপমেন্ট প্রফেশনাল হিসেবে ইউরোপীয় প্রজেক্ট ম্যানেজার হওয়ার সুযোগটি কীভাবে এল? আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইউরোপের তরুণদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

সিনথিয়া খন্দকার: সিয়নসপোতে পড়ার সময়েই আমার ব্যাচমেটদের দেখতাম—তারা পড়াশোনার পাশাপাশি ওইসিডি কিংবা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মতো প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ ও চাকরি করছে। ইউরোপীয় নাগরিক হওয়ার কারণে তাদের পদগুলো পাওয়া সহজ ছিল, কিন্তু একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে আমার জন্য সে পথটা ছিল বেশ আইনি ও নীতিগত জটিলতায় পূর্ণ।

তবে আমি মনে মনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম—আমার যদি যোগ্যতায় কমতি না থাকে, তবে আমি ফ্রান্সে পেশাদার ক্যারিয়ার গড়বই। পড়াশোনা শেষে আমি টানা ৫০ টিরও বেশি কোম্পানিতে আবেদন করি। কয়েক মাসের দীর্ঘ অপেক্ষার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে সাক্ষাৎকারের ডাক পাই।

তারা এমন একজনকে খুঁজছিল যে একাধারে ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় পারদর্শী, যার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে (যেমনটি আমি পূর্বে হংকং এবং প্যারিসের ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সে অর্জন করেছিলাম) এবং যার মধ্যে প্রজেক্ট নেতৃত্বের গুণাবলি রয়েছে। কয়েক দফার কঠিন ইন্টারভিউ শেষে তারা আমাকে ইউরোপিয়ান প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে মনোনীত করে।

পরবর্তী প্রায় ছয় বছর ধরে আমি ইউরোপীয় ইউনিয়নের তরুণদের হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট, প্রফেশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট, তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি এবং সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সংক্রান্ত বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট সফলভাবে পরিচালনা করেছি। দূর দেশ থেকে গিয়ে ইউরোপের তরুণদের উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করাটা ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক ও তৃপ্তিদায়ক একটি অভিজ্ঞতা।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

কর্মজীবনের এত ব্যস্ততা ও লড়াইয়ের মাঝেও কিন্তু আপনাকে আমরা দেখি একদম মুক্ত বিহঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াতে। আল্পস পর্বতমালায় স্কি করা, পাহাড়ের চূড়ায় উঁকি দেওয়া—ভ্রমণের এই অদম্য নেশাটা আপনার মধ্যে কীভাবে তৈরি হলো?

সিনথিয়া খন্দকার: ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ড্রয়িংরুমে বসে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল দেখতাম। বাবা প্রকৃতি খুব ভালোবাসতেন। টিভি পর্দায় পৃথিবীর সুন্দর সুন্দর পাহাড়, নদী আর অজানা এলাকাগুলো দেখে ছোটবেলা থেকেই মনে হতো—আল্লাহর বানানো এই সুন্দর পৃথিবীটা কত বড়! যদি সুযোগ পাই, তবে নিজের চোখে এই সৃষ্টিকে কেন দেখব না।

প্যারিসে পড়ার সময় ইউনিভার্সিটির বিশাল লাইব্রেরিতে গিয়ে আমি জিওগ্রাফি, নৃবিজ্ঞান ও টুরিজম সেকশনের বইগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়তাম। যখন ফ্রান্সে নিজের পায়ে দাঁড়ালাম, সিদ্ধান্ত নিলাম কাজের ফাঁকে ২-৩ দিনের ছুটি পেলেই আমি প্রকৃতির কাছে ছুটে যাব। এভাবেই আল্পস পর্বতে যাওয়া, স্কি শেখা, পাহাড়ি ট্রেইল ‘ভিয়া ফেরাটা’ জয় করা। কাজের ক্লান্তি দূর করে প্রকৃতির এই সান্নিধ্যই আমাকে নতুন করে বাঁচার ও কাজ করার শক্তি দেয়।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনার ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা যদি একটু বলতেন। আমরা জানি আপনার অন্যতম একটি স্বপ্ন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে কাজ করা। এর বাইরে নিজের দেশ বা তরুণদের নিয়ে আপনার কী ভাবনা?

সিনথিয়া খন্দকার: হ্যাঁ আপু, প্রফেশনালি ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের নীতি নির্ধারণী পদে কাজ করার একটি তীব্র ইচ্ছে আমার রয়েছে। তবে এর বাইরে আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো সমাজ ও তরুণদের জন্য কিছু করে যাওয়া।

ফ্রান্সে কাজের পাশাপাশি আমি বিভিন্ন ফিলানথ্রপিক বা সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছি। আমি শরণার্থী পুনর্বাসন এবং নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করা দুটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত। এই কাজগুলো করতে গিয়ে আমি গভীরভাবে অনুভব করেছি—নিজের ব্যক্তিগত জীবন ও ক্যারিয়ারের বাইরেও সমাজকে দেওয়ার মতো আমাদের অনেক কিছু রয়েছে।

আমার ইচ্ছে আছে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে একটি স্থায়ী প্রজেক্ট বা ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা, যা তরুণদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট, নেতৃত্ব বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি দিকনির্দেশনা দেবে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

প্রথম আলো ট্রাস্টের 'অদ্বিতীয়া' পরিবারের সঙ্গে আপনার যে নিবিড় যোগাযোগ, তা নিয়ে কী বলতে চান?

সিনথিয়া খন্দকার: প্রথম আলো ট্রাস্ট ও এইউডব্লিউ আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক অনন্য আশীর্বাদের নাম। সেই ২০১২ সালে প্রথম আলো ট্রাস্টের ‘অদ্বিতীয়া’ শিক্ষাবৃত্তি ও এইউডব্লিউ’র স্কলারশিপ না পেলে হয়তো চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে আমার যাওয়া হতো না, আর আজকের এই ফ্রান্সের সিনথিয়াকেও হয়তো পৃথিবীর কেউ চিনতে পারত না।

প্রথম আলো ট্রাস্ট আমাকে কেবল আর্থিক সুবিধাই দেয়নি, আমাকে একটি বিশালাকার পরিবারের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। আমি সব সময় অদ্বিতীয়াদের পাশে থাকতে চাই। আমার জীবনের এই দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প শুনে যদি দেশের অন্তত একজন তরুণী বা তরুণও নিজের স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস রাখার সাহস পায়, তবেই আমার জীবনের সব কষ্ট সার্থক হবে বলে মনে করি।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনার এই সাহসী ও প্রেরণাদায়ক পথচলা আমাদের পুরো দেশের জন্য এক গর্বের বিষয়। আপনার ডানা মেলার এই অদম্য উড্ডয়ন কখনোই না থামুক। আপনি, আপনার বাবা-মা ও পুরো পরিবারের প্রতি প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে রইল অশেষ শুভকামনা ও ভালোবাসা। আমাদের স্টুডিওতে আসার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

সিনথিয়া খন্দকার: আপনাকে এবং প্রথম আলো ট্রাস্টকেও অনেক অনেক ধন্যবাদ।