সাক্ষাৎকার

জুমচাষ ও বায়োডাইভারসিটি উভয়ই রক্ষা পাবে, এমন বিষয়ে গবেষণা করছেন সোমাশ্রী

প্রথমে আলো ট্রাস্টের সঙ্গে যারা নিয়মিত আছেন তারা জানেন যে প্রথমে আলো ট্রাস্টের অন্যতম একটি প্রকল্প অদ্বিতীয়া প্রকল্প, যে প্রকল্পে পরিবারের প্রথম কন্যা সন্তান তাঁর পরিবারের আর্থিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠে পড়াশোনার পথে, উচ্চশিক্ষার পথে পা বাড়ায় এবং দেশ গঠনে স্বপ্ন দেখেন তারাই আমাদের অদ্বিতীয়া। ২০১২ সালে এই প্রকল্পটি শুরু হয়। ২০১৭ সালে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয় আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসি।

প্রতি মাসে ‘অদ্বিতীয়া গল্প’ অনুষ্ঠানে আমরা একজন অদ্বিতীয়ার গল্প শুনি। ৩০ নভেম্বর বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠেয় ‘অদ্বিতীয়ার গল্প’ অনুষ্ঠানে আমাদের সঙ্গে ছিলেন পার্বত্য জেলা রাঙামাটির মেয়ে সোমাশ্রী চাকমা। তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। সাক্ষাৎকারটি অনুলিখন করেছেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. নাজিম উদ্দিন।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

স্বাগত সোমাশ্রী, কেমন আছেন?

সোমাশ্রী চাকমা: জি, আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

ভালো আছি সোমাশ্রী। প্রথমেই আপনাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে রাখি। শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আপনি, একদমই অল্প কিছু সময়ের মধ্যে আপনি স্নাতক শেষ করবেন এবং আপনার যেই স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন পূরণের পথে একটা ধাপ এগিয়ে যাবেন। ছোটবেলার গল্পটা শুনব, কিন্তু তার আগে আমি একটা বিষয়ে খুব জানতে আগ্রহী। আপনি জুমচাষের বায়োডাইভার্সিটি রক্ষায় কাজ করতে চান। এই বিষয়টা নিয়ে আগ্রহ তৈরি কিংবা এই বিষয়টা নিয়ে কাজ করলে পরবর্তীতে আপনি নিশ্চয়ই আপনার কমিউনিটির কথা চিন্তা করে করেছেন। এই পুরো ভাবনাটা একটু জানতে চাই।

সোমাশ্রী চাকমা: আমি যখন প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলাম, তখনই আমার এই রিসার্চের টপিক আমার মাথায় এসেছিল যে ফাস্ট আমি আমার কমিউনিটির জন্য কিছু করতে চাই। সেকেন্ড আমি আমার মেজর পরিবেশবিজ্ঞান, পরিবেশের আমাদের যে চিটাগাং হিল ট্র্যাক্সের (সিএইচটি) পরিবেশ নিয়ে কিছু কাজ করতে চাই। এই দুইটা জিনিস মাথায় রেখে আমার থিসিসের প্ল্যান আসে। আমি ভাবলাম আমরা বহুকাল ধরে সিএইচটিতে জুমচাষ করে আসছি। আগে হয়তো জমির পরিমাণ বেশি ছিল, অনেক পশুপাখি ছিল, বায়োডাইভার্সিটি অনেক রিচ ছিল। কিন্তু আমাদের যে ট্রেডিশনাল এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস এটার ফলে দেখা যাচ্ছে যে বায়োডাইভার্সিটিতে সাসটেইন করা পসিবল হচ্ছে না। তাই আমি ভাবলাম যে, আমি রিসার্চের মাধ্যমে এমন একটা বিষয় দাঁড় করাতে চাই যেখানে জুমচাষ ও বায়োডাইভারসিটি উভয়কে সেভ করা যাবে। এমন একটা বিষয় প্রমাণ করতে পারলে আমার কমিউনিটির জন্য কিছু করা হবে। এ ছাড়া আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো বাংলাদেশের কোনো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে বা বিদেশে মাস্টার্স করার।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

তার মানে একদম শুরু থেকেই অনেকগুলো স্বপ্ন, অনেকগুলো বিষয় মাথায় রেখে এই বিষয়টিকে পছন্দ করা এবং সেভাবেই কাজ করা। এবার আপনার ছোটবেলার গল্পটা জানতে চাই, আপনি যে পরিবেশে বড় হয়েছেন, সে পরিবেশটা কেমন ছিল?

সোমাশ্রী চাকমা: ছোটবেলা বলতে আমার জন্ম রাঙামাটিতে, আমি ছোট থেকে রাঙামাটির পাহাড়ি অঞ্চলে বড় হয়েছি। আমার বাড়ির কাছে প্রাইমারি স্কুল পরে মোনঘর রেসিডেন্সিয়াল হাইস্কুল শিফট হয়ে যাই। আমি মোনঘর স্কুলে পড়ার সময় ২০০৮ সালে আমার বাবা মারা যান। তখন থেকেই একটু টানাপোড়েন শুরু হয়। তারপরও আমার মা যিনি আমাদের হাউস হোল্ডার এখন হোম মেকার, উনি অনেক চেষ্টার প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের দুই ভাইবোনকে বড় করেন। আমরা সব সময় জুমচাষ দেখে দেখে বড় হয়েছি। যখন আমি পরিবেশবিজ্ঞান সাবজেক্টটাকে মেজর হিসাবে নিলাম, তখন দেখলাম যে পরিবেশের অনেক কিছুই রিলেট করতে পারছি।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

নিশ্চয়ই, এইউডব্লিউ এর খবরটা আপনি জানলেন কি করে?

সোমাশ্রী চাকমা: আমি যখন কলেজে ছিলাম, তখন রাঙামাটির বাইরের পরিবেশটা দেখার ইচ্ছা হতো। এইচএসসি পাশের পর আমার মাকে বললাম যে ‘আমি বাইরে পড়তে চাই। ঢাকা, চিটাগাং কোনো একটা ভালো ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেলে আমি পড়াশোনা করতে চাই।’ ওই সময়টাতে আমার এক ফ্রেন্ড এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের কথা জানায়। সে আবেদন করবে। আমরা কেউ আবেদন করব কিনা জানতে চাইল। আমাদের যারা সিএসটির মানুষ আছে চাকমা, মারমা, রোয়াং, আরও যারা জাতিগোষ্ঠী আছে, তাদের স্কলারশিপ দেয় এইউডব্লিউ। সব জেনেশুনে আমরা আবেদন করি। পরে আমরা তিনজন ফ্রেন্ড মিলে খাগড়াছড়ি গেলাম। ওখানে এক রাত থেকে আমরা পরীক্ষায় বসলাম। ফরচুনেটলি আমরা তিনজন ফ্রেন্ড থেকে দুজনের হয়ে গেল। আমি ছিলাম একজন। পরে অবশ্য একমাত্র মেয়েকে দূরে আসতে দিতে চায়নি মা।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনি যখন এইউডব্লিউতে আসলেন, এখানকার পরিবেশটা তো একটু অন্যরকম। এখানকার প্রফেসররা দেশের বাইরের, রুমমেটস ফরেনার। সেই নতুন পরিবেশে এসে সোমাশ্রী কিভাবে সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিল? ক্লাসের সঙ্গে, ক্লাসমেটদের সঙ্গে, রুমমেটস, পড়াশোনা, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা, ক্লাব অ্যাকটিভিটিস—সবকিছুর সঙ্গে সোমাশ্রী কিভাবে নিজেকে মানিয়ে নিল? নাকি মনে হতো যে আমি রাঙামাটি চলে যাই?

সোমাশ্রী চাকমা: এটা মনে হয়নি। আমি আমার মায়ের একমাত্র মেয়ে এবং আমি আমার ফ্যামিলি থেকে ফার্স্ট মেয়ে যে ইউনিভার্সিটি লেভেল পর্যন্ত যেতে পেরেছি। প্রথম দিকে একটু কষ্ট হয়েছে, যেহেতু আমার স্কুল কলেজে বাংলা মিডিয়ামে পড়াশোনা করেছি। ইউনিভার্সিটিতে সবকিছু ইংরেজি মাধ্যমের হওয়ায় এটা হয়েছে। তবে আমি আমার ফেলোমেট আর রুমমেটসদের সঙ্গে ট্রাই করতাম কমিউনিকেট ভালো করে করার জন্য। হয়তো গ্রামাটিক্যাল মিসটেক থাকত, তাও আমি চেষ্টা করতাম। এভাবে আস্তে আস্তে, কথা বলতে বলতে জড়তা কেটে যায়। অন্যদিকে এইউডব্লিউ অলওয়েজ চেষ্টা করে ফিউচার লিডারগুলোকে গ্রো করার জন্য। আমার দ্বিতীয় বর্ষের দিকে আমার মধ্যে ওই লিডারশিপ স্কিলটা চলে আসছে অটোমেটিক্যালি। তখন আমি তিনটা ক্লাবে ঢুকে গেলাম। কমিউনিকেশন ম্যানেজার হিসেবে ঢুকে গেলাম। তারপর ট্রেজারার হিসেবে ঢুকে গেলাম আরেকটা ক্লাবে। এর মধ্যে এনভার্মেন্টাল সায়েন্স ক্লাব যেটা পরিবেশ বিজ্ঞান ক্লাবে কমিউনিকেশন ম্যানেজার হিসেবে ছিলাম। তারপর ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ক্লাবে, উইমেন অ্যাক্রস বর্ডার ক্লাব যেটা আমরা অনেকগুলো কান্ট্রির মহিলাদের নিয়ে, বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করি, যারা আন্ডার প্রিভিলেজড বাচ্চা, তাদের পড়াশোনার ব্যাপারে কাজ করি। এগুলো যখন আমি করা শুরু করে দিলাম, ও রকম করতে করতে আমার মধ্যে লিডারশিপ স্কিলটা আস্তে আস্তে আসা শুরু করে দিল। এমন করে কখন যে জড়তা কেটে গেছে। এখন আমি আউট স্পোকেন করতে পারি।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

কনফিডেন্সটা তৈরি হয়ে গেছে আপনার। এই কনফিডেন্সটা সব সময় থাকুক, এটা আমাদের এই শুভকামনা থাকবে। আপনি সবার জন্য একটা আদর্শ, একটা রোল মডেল হিসেবে থাকেন, এটা আমাদের শুভকামনা থাকবে।

এখন মায়ের অনুভূতি কী? আর এখন যারা অদ্বিতীয়া আছে, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী থাকবে?

সোমাশ্রী চাকমা: আমার মাকে নিয়ে একটা উদাহরণ দিই, এটা রিয়েল। আমি যখন ‘অদ্বিতীয়া'বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হই তখন আমাদের নিয়ে প্রথম আলো ছবিসহ নিউজ ছেপেছিল। ওই সময় আমার প্রতিবেশী, গ্রামের মানুষ নিউজ দেখে আমার ছবি দেখে আমার মাকে কল তা জানিয়েছিল। আমার তখন খুব খুশি হয়েছিল এবং তাদের সবাইকে বলেছে যে, আমার মেয়ে অদ্বিতীয়া নামে প্রথম আলো ট্রাস্টের স্কলারশিপ পেয়েছে।’ এ রকম করে যখন আমার মা এই জিনিসটা আমাকে বলছিল, তখন ওনার মুখ দেখলে বোঝা যাচ্ছিল উনি কতটুকু ওভারওয়ালমড হয়েছেন। এখন আমাদের নিজের গ্রাম বা পাড়া বা অন্য গ্রামের মানুষের কলেজে পড়ুয়া মেয়ে, যারা ইউনিভার্সিটি পড়াশোনা করতে চায় তাদের বাবা-মায়েরা আমার মায়ের কাছে এসে পরামর্শ নেয়।

তারপর সেকেন্ড প্রশ্ন যেটা, সে ক্ষেত্রে বলব যে, আমরা ছোট জায়গা থেকে বড় জায়গায় চলে আসছি। আমরা হয়তো অনেকে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ছিলাম বা গ্রাম থেকে ছিলাম। এ রকম অঞ্চল থেকে অনেকে পড়াশোনা করার জন্য এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন আমাদের সাহায্য করেছে এবং অদ্বিতীয়া বৃত্তি আরও এক ধাপ এগিয়ে আমাদের সাহায্য করছে আমাদের লাইফ স্মুথ করার জন্য। আমরা কিন্তু অনেকে স্ট্রাগল করে এই পজিশনে এসেছি। কোনো অবস্থাতেই আমরা দমে যাব না। সমাজে বা এইউডব্লিউতে আমাদের পজিশনটা স্ট্রং করার জন্য সব সময় কাজ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে। নিজেকে তুলে ধরতে হবে। আমি ফিউচারে অদ্বিতীয়াদের বলব যে, আউট স্পোকেন হওয়া লাগবে, তারপর কমিউনিকেশন ভালো করে শিখা লাগবে, মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা, আপনার স্বপ্নপূরণ হোক, আপনার পরিবারের সবার স্বপ্নপূরণ হোক। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আপনি ভীষণ ভালো থাকেন, পেশাগত জীবনে ভালো করুন এবং ব্যক্তিগত জীবনে ভালো থাকুন। অনেক অনেক ধন্যবাদ সোমাশ্রী। শুভেচ্ছা আপনার জন্য, শুভকামনা আপনার জন্য।

সোমাশ্রী চাকমা: আপনাদেরও ধন্যবাদ আমার পাশে থাকার জন্য।