মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সুনছড়া চা-বাগানের মেয়ে বন্যা উরাং। চা-বাগানের কাজে যে আয় হয়, তা দিয়ে পরিবার চালানোই কঠিন। সেখানে পড়াশোনা করাটা অনেকটা বিলাসিতা। তবে আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যেও বন্যা উরাং থেমে থাকেননি। নিজের একান্ত চেষ্টায় স্নাতক পর্যন্ত যেতে পেরেছেন। তিনি ২০২০ সালে আইডিএলসি-প্রথম আলো ট্রাস্টের ‘অদ্বিতীয়া’ শিক্ষাবৃত্তি পান। শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের রাজনীতি, দর্শন ও অর্থনীতি (পিপিই) বিভাগে স্নাতক পড়াশোনা করেন। সম্প্রতি তিনি স্নাতক শেষ করে সমাবর্তনে অংশ নিয়েছেন।
সমাবর্তনে অংশ নিয়ে নিজের অনুভূতির কথা জানালেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা জীবনে, দীর্ঘ চার বা পাঁচ বছর পর যখন স্নাতক ডিগ্রি গ্রহণের সময় আসে, তখন মনে একসঙ্গে অনেকগুলো অনুভূতি কাজ করে। আমার শুরুতেই আনন্দ অনুভব হচ্ছে এ জন্য যে, বহু রাত জেগে পড়াশোনা, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্টসহ অসংখ্য চাপের শেষে একটি বড় অর্জন ধরা দিয়েছে আমার হাতের মুঠোয়। এই আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গর্ববোধ, আমার চা-শ্রমিক বাবা-মা হয়তো জানেন না, আমি ঠিক কোন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করেছি। কখনো দেখেনি কোথায় পড়েছি, কোথায় থেকেছি। শুধু নিঃশর্তে আমার ওপর ভরসা, বিশ্বাস রেখেছে। সেই বিশ্বাস ভরসার মর্যাদা রেখে আমার পরিবার থেকে প্রথম উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী হতে পরে আমি সত্যিই গর্বিত। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, সেই সব গুণী ও সাহায্যপরায়ণ মানুষজনদের যাদের সাহায্য সহযোগিতা আমার এই শিক্ষা জীবনের পথকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তবে এই আনন্দ ও গর্ববোধের সঙ্গেই মনের কোনায় দাঁড়িয়ে আছে এক নিঃশব্দ শূন্যতা। পরিচিত ক্লাসরুম, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময়, ক্যাম্পাসের প্রতিদিনের নানা রকমের ব্যস্ততা, সবকিছুই হঠাৎ করে স্মৃতিতে রূপ নিয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিয়ে আশা কাজ করছে। আবার, অজানা পথে পা বাড়ানোর এক নীরব ভয়ও হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, এই স্নাতক ডিগ্রি অর্জন শুধু সনদ পাওয়া নয় বরং এটি জীবনের একটি অধ্যায় সম্পূর্ণ করে, আরেকটি নতুন অধ্যায়ের শুভ সূচনা। জীবনে ঘটে যাওয়া ভুল, আরও কিছু শেখার আগ্রহ এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন—এই সবকিছুকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক দৃঢ় প্রতিশ্রুতিই হচ্ছে স্নাতক ডিগ্রি।’
উল্লেখ্য, গত শনিবার (১০ জানুয়ারি) এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) ১২ তম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি চট্টগ্রাম নগরের র্যাডিসন ব্লু চট্টগ্রাম বে ভিউর মেজবান হলে অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৫৩ জন শিক্ষার্থীকে সনদ দেওয়া হয়। এই ২৫৩ জনের একজন হলেন বন্যা উরাং। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এইউডব্লিউর আচার্য শেরি ব্লেয়ার। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখায় সাতজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে দেওয়া হয় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি। সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়া সাতজন বিশিষ্ট ব্যক্তিসহ এইউডব্লিউর উপাচার্য ড. রুবানা হক ও এইউডব্লিউয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কামাল আহমেদ বক্তব্য দেন।