এইউডব্লিউর যাত্রাটা কেমন ছিলো জানতে চাইলে জাহিদা বলেন, ‘জার্নিটা সহজ ছিলো না। পরিবারের সমর্থন যদিও ছিলো, প্রতিবেশিরা বলত-মেয়েকে কোথায় পাঠাচ্ছো, ওটা বিদেশি এনজিও-মেয়েকে বেচে দিবে! এমন সব কথা। কেউ কেউ বলেছে, গ্রামের পাশে ভর্তি করাও, বিদে দিয়ে দাও। এগুলো সত্ত্বেও আমার মনোবল ও পরিবারের সাপোর্টে আজকে এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি।’

‘শুরুটা কঠিন ছিলো আমার জন্য। প্রথমে অদ্বিতীয়া শিক্ষাবৃত্তির জন্য মনোনিত হই। ক্লাস শুরু করি। এইউডব্লিউ প্লাটফর্ম একদম নতুন ছিল আমার জন্য। যেহেতু ১৯ দেশের মেয়েরা  পড়েন, তাই সাংস্কৃতিক বাধার মধ্যে পড়তে হয়েছে আমাকে। ভাষাগত সমস্যা ছিল, এগুলো আস্তে আস্তে কাটিয়ে ওঠেছি। প্রথমে ভেবেছিলাম..এসএসসি ও এইচএসসিতে যেমন ভালো ফল করেছি..এখানে ভাষাগত বাধার কারণে হয়তো পারব না। কিন্তু প্রথম সেমিস্টারে আমি ৪ এ ৪ পেয়েছি। এটা আমাকে দারুণভাবে মটিভেট করেছে।’

এইউডব্লিউতে কাজ করেছেন,নিজের অভিজ্ঞতা ও বাবা মার অনুভূতি কেমন? এর উত্তরে জানান, ‘মা-বাবা খুব খুশি। তাঁরা আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছেন। মেয়েদের পড়াশোনার সামাজিক ও আর্থিক নান বাধা থাকা স্বত্তেও আমার নিজের গ্রাম থেকে ৭ জনকে এখানে ভর্তি করাতে পেরেছি। এটা আমার কাছে বড় পাওয়া বলে মনে করি।’

ভবিষ্যতে কি করতে চান জানতে চাইলে জানান, ‘সবাই সামনে ছুটে যায়, আমিও হয়তো যাব। তারপরও মানুষ যা চায় তার সব করতে পারে না। আমার ও পরিকল্পণা আছে। আপাতত পারিবারের হাল ধরার জন্য চাকরিটা করতে চাই। অভিজ্ঞতা গেদার করে সামনে এগুতে চাই। দেশের বাইরে থেকে মাস্টার্স করারও পরিকল্পনা আছে।’

কেউ কেউ বলেছে, গ্রামের পাশে ভর্তি করাও, বিদে দিয়ে দাও। এগুলো সত্ত্বেও আমার মনোবল ও পরিবারের সাপোর্টে আজকে এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি।

এখন যাঁরা অদ্বিতীয়া আছেন, তাঁরা কীভাবে এ সিদ্ধান্ত নেবেন, তা জানতে চাওয়া হলে জাহিদা নিজের উদাহরণ দিয়েই বলেন, ‘বোন হিসেবে বলব, আমি বাড়ি থেকে দূরে এসে যে সসম্যাগুলো ফেস করেছি তারা যেন না করে।তোমরা অনেক ভাগ্যবান যে, এ রকম একটা পরিবেশে আসতে পেরেছ। তা ছাড়া আমি যেহেতু ক্যাম্পাসেই আছি — যেকোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে পার। আমার সধ্যমতো চেষ্টা করব।’

এইউডব্লিউ'তে এসে নিজেকে কীভাবে খাপ-খাওয়ালেন জানাতে চাইলে  জাহিদা বলেন, ‘আসলে আমরা যারা বাংলা  মিডিয়াম থেকে আসা তাদের একটু সমস্যা হয় প্রথম দিকে। তবে এইউডব্লিউতে হাতে কলমে আনন্দের সঙ্গে পড়ানো হয়। এখানে বালাদেশি নিয়মে চলে না। পড়াশোনাটা আনন্দপূর্ণভাবে হয়েছে। একটা বিষয় হলো-প্রথম বছর আমাদের ফাউন্ডেশন কোর্স করতে হয়েছে। যার মাধ্যমে টিচারদের সঙ্গে ক্লোজ ইন্টারেক্ট করেছি, আমাদের বিভিন্ন গ্রুপ ওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করেছি। অনেক সাপোর্ট পেয়েছি শিক্ষকদের কাছ থেকে। আমরা ইচ্ছা — আমার গ্রামের পিছিয়ে পড়া মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য মোটিভেট করার চেষ্টা করব সবসময়।’

উল্লেখ্য, নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ২০১২ সাল থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এবং প্রথম আলো ‘ফার্স্ট ফিমেল ইন দা ফ্যামিলি স্কলারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ নামে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান শুরু করে। প্রতিবছর পরিবারের প্রথম নারী অথচ অসচ্ছল, যিনি উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজ গঠনে আগ্রহী, এ রকম ১০ জনকে ট্রান্সকম গ্রুপের সহায়তায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে এ শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া শুরু করে প্রথম আলো ট্রাস্ট। ট্রান্সকমের সহায়তায় ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৪২ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছেন।

২০১৭ সাল থেকে আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড এই শিক্ষাবৃত্তির দায়িত্ব নেয়। নতুনভাবে নামকরণ করা হয় ‘অদ্বিতীয়া’ নামে। আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের সহায়তায় ৪৬ জনসহ ২০২১ পর্যন্ত মোট ৮৮ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছেন। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনও তাঁদের আবাসন, টিউশন ফি সুবিধাসহ নানা সুযোগ দেয়।

অনুষ্ঠানটি একযোগে সম্প্রচারিত হয় প্রথম আলো ও প্রথম আলো ট্রাস্টের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা।