দীপা সিং, আমাদের অনুষ্ঠানে আপনাকে স্বাগত। কেমন আছেন?
দীপা সিং: জি আদাব আপু। আমি ভালো আছি।
দীপা, শুরুতেই আমি বলছিলাম যে ‘অদ্বিতীয়া’ আসলে তারাই, যারা পরিবারের প্রথম কন্যা সন্তান হিসেবে উচ্চশিক্ষার পথে পা বাড়িয়েছেন। আপনার নাছোড়বান্দা হয়ে ওঠার গল্প এবং আপনার ছোটবেলা সম্পর্কে আমাদের একটু বলুন।
দীপা সিং: আমার নাম দীপা সিং। আমার ছোটবেলার কথা বলতে গেলে, আমার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল ব্র্যাক স্কুল থেকে। স্কুলটি আমাদের বাড়ি থেকে বেশ দূরে ছিল, প্রায় আধা ঘণ্টা হেঁটে যেতে হতো। আমাদের চা বাগান অঞ্চলের শিক্ষার মান বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা তখন অতটা ভালো ছিল না। কিন্তু আমার বাবা-মায়ের খুব ইচ্ছা ছিল আমি যেন ভালো পড়াশোনা করি। এরপর আমি মুন্সিবাজার কালীপ্রসাদ উচ্চবিদ্যালয় থেকে হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করি এবং পরবর্তীতে কলেজ গণ্ডি পার করি।
আপনার এই পথচলা যে বেশ কঠিন ও সংগ্রামের ছিল, তা বোঝাই যাচ্ছে। আপনি যখন উচ্চমাধ্যমিক পাস করলেন, তখন কি এই এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের মতো কোনো আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখতেন? নাকি আগে থেকেই এই প্রতিষ্ঠানের কথা জানতেন?
দীপা সিং: সত্যি বলতে আপু, আমি যখন হাইস্কুলে পড়তাম, তখন ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বা ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমি ভাবতাম সরকারি কলেজগুলো থেকেই মানুষ অনার্স কমপ্লিট করব। কলেজে ওঠার পর যখন প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানতে পারি, তখন মনে মনে স্বপ্ন জাগে যে আমিও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব। আমি এইচএসসির পাশাপাশি প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করি। কিন্তু প্রথমবার আমার কাঙ্ক্ষিত জায়গায় সুযোগ হয়নি, তাই মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে যাই। তবে মনের ভেতরের সেই স্বপ্নটা মরেনি। আমি দ্বিতীয়বার চেষ্টা করি এবং ঈশ্বরের কৃপায় সুযোগ পেয়ে যাই।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের মতো মেয়েদের জন্য একটি বিশেষায়িত ও আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রমের বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ধান আপনি কীভাবে পেলেন?
দীপা সিং: আমার এক মামার কাছ থেকে আমি প্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা জানতে পারি, যিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, যেহেতু আমরা চা-বাগান অঞ্চল থেকে এসেছি, আমাদের পরিবারগুলো মেয়েদের দূরের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সহজে পাঠাতে চায় না। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা, খাওয়া এবং পড়াশোনার সবকিছুই স্কলারশিপের আওতায় সম্পূর্ণ ফ্রি। এটা জানার পর থেকেই আমার তীব্র ইচ্ছা জাগে এখানে পড়ার।
আপনি সিলেট অঞ্চলের মেয়ে, আর বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে। তা ছাড়া চা বাগানের সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়েদের এত দূরে পাঠানো নিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতা থাকে। আপনার পরিবার, বিশেষ করে আপনার বাবা-মা এবং আশপাশের মানুষ বিষয়টিকে কীভাবে নিয়েছিলেন?
দীপা সিং: আমার মায়ের ইচ্ছা ছিল আমি যেন জীবনে বড় কিছু করি। তিনি যখন আমার সুযোগ পাওয়ার খবর শুনলেন, অনেক খুশি হয়েছিলেন। আশপাশের মানুষ অনেক নেতিবাচক কথা বলেছিল যে—‘মেয়েকে এত দূরে পাঠাচ্ছ, কীভাবে থাকবে, খোঁজ রাখতে পারবে না’। কিন্তু আমার মা দৃঢ় ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সবাই না করলেও আমি আমার মেয়েকে পাঠাব।’ মায়ের এই সাহস ও পুরো পরিবারের সমর্থনই আমাকে সমস্ত বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করেছে।
চট্টগ্রামে এসে আপনি তো এক ভিন্নধর্মী পরিবেশের মুখোমুখি হলেন। এখানে রুমমেটরা বিদেশি, শিক্ষকেরা বিদেশি এবং ক্লাসের পুরো যোগাযোগটাই করতে হয় ইংরেজিতে। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা তো উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বাংলায় পড়ে অভ্যস্ত। এই সম্পূর্ণ নতুন এবং ডাইভার্স পরিবেশের চ্যালেঞ্জ আপনি কীভাবে সামলে নিলেন?
দীপা সিং: প্রথম এক-দুই মাস আমার ভীষণ খারাপ কেটেছিল, কোনোভাবেই মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। আমি ছোটবেলা থেকেই মা-বাবার সঙ্গে থেকে অভ্যস্ত। এই নতুন পরিবেশে এসে আমি প্রতিদিন মাকে ফোন করে কাঁদতাম এবং বলতাম আমি আর থাকতে পারছি না। যদিও আমি কমার্সের স্টুডেন্ট ছিলাম এবং অ্যাকাউন্টিং বা ব্যাংকিংয়ের বিষয়গুলো পছন্দ করতাম, কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলার অভ্যাস তো আগে ওভাবে ছিল না। তবে আমি হাল ছাড়িনি। মা আমাকে সাহস দিয়ে বলতেন, ‘সবাই পারলে তুমিও চেষ্টা কর, আমার বিশ্বাস তুমি পারবে।’ মায়ের কথা থেকে সাহস পেয়ে আমি ইউটিউব দেখে ইংরেজি চর্চা শুরু করি। তা ছাড়া আমার ক্যাম্পাসের বিদেশি বন্ধুদের দেখেও আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি। ওরা নিজেদের দেশ-পরিবার ছেড়ে কত দূরে এসে মানিয়ে নিয়েছে, তাহলে আমি কেন পারব না? এই জেদ থেকেই নিজেকে ফিট করে নিয়েছি।
আপনি এখন জনস্বাস্থ্য নিয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। পড়াশোনা শেষ করে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্বপ্ন কী?
দীপা সিং: আমার মূল পরিকল্পনা জনস্বাস্থ্য বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা এবং একই সঙ্গে নারী শিক্ষা নিয়ে কাজ করা। বিশেষ করে আমার নিজের চা বাগান কমিউনিটির জন্য কাজ করার তীব্র ইচ্ছা আছে। আমাদের চা বাগান থেকে এখন অনেকেই পড়াশোনা করে দেশের বাইরেও যাচ্ছেন, কিন্তু সামগ্রিক বাস্তবতার বা সমাজের খুব একটা বড় পরিবর্তন এখনো হয়নি। তাই পড়াশোনা শেষ করে আমি মানবসেবা ও নারী শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে আমার সমাজের এই বাস্তবতার পরিবর্তন করতে চাই।
এখন আপনিতো ভীষণ ব্যস্ত। দিন-রাত মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, টার্ম পেপার প্রস্তুতির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লাব অ্যাক্টিভিটি যেমন—বিজনেস ক্লাব, স্পোর্টস বা কালচারাল ক্লাবের কাজ সামলাতে হয়। এই মাল্টিটাস্কিং আপনি কীভাবে করেন? আপনার টিপস কী?
দীপা সিং: আমার মনে হয় মনোবল থাকলে সবকিছুই সম্ভব। যেহেতু এগুলো আমাদের পাঠ্যক্রমের অংশ, তাই নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করে নিয়েছি। আমরা পড়াশোনা এবং ক্লাস প্রেজেন্টেশনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই। এর বাইরে আমাদের অতিরিক্ত পি-ক্লাস (Physical Education) করতে হয়, যেমন আজই আমার মিড-টার্ম পরীক্ষা ছিল, কিন্তু গতকালও আমাকে পি-ক্লাস করতে হয়েছে। এসবের মাঝেই যখন আমরা ফ্রি থাকি, তখন ক্লাবের কাজগুলো করি। যতটুকু সম্ভব সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি।
প্রতি সেমিস্টারেই তো অনেক নতুন শিক্ষার্থী এখানে ভর্তি হন। তারা এসেও তো আপনার মতোই প্রথম দিকে হোমসিকনেস বা ভাষা নিয়ে মন খারাপের মধ্যে পড়বে। তাদের উদ্দেশ্যে আপনার কী পরামর্শ থাকবে?
দীপা সিং: আমার প্রথম পরামর্শ থাকবে ইংরেজিকে অনেক বেশি প্রায়োরিটি দেওয়া। যেহেতু এখানে আসার পর আমি নিজে এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম, তাই বলছি—ইংরেজিটা জানা থাকলে এখানে এসে অনেক বড় ধাক্কা থেকে বেঁচে যাওয়া যায়। আর মন খারাপের বিষয়টি খুব স্বাভাবিক, প্রথম এক-দুই মাস এমন লাগবেই। কিন্তু যত দ্রুত সম্ভব সেই মন খারাপ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কারণ এখানে যদি প্রথম সেমিস্টারে সিজিপিএ খারাপ হয়ে যায়, তবে পরবর্তী সেমিস্টারগুলোতেও তার নেতিবাচক প্রভাব থেকে যায়। তাই একদম শুরু থেকেই মনোবল ধরে রাখতে হবে।এই যে জীবনে নানা বৈরিতা বা একাকিত্বে মনোবল ভেঙে যায়, সেই মনোবল ধরে রাখার কোনো বিশেষ টিপস কি আপনি দেবেন?
এই যে জীবনে নানা বৈরিতা বা একাকিত্বে মনোবল ভেঙে যায়, সেই মনোবল ধরে রাখার কোনো বিশেষ টিপস কি আপনি দেবেন?
দীপা সিং: নিজেকে যত বেশি সম্ভব ব্যস্ত রাখা। ক্যাম্পাসে প্রতিদিন কোনো না কোনো অনুষ্ঠান, প্রফেসরস লেকচার বা ক্লাব অ্যাক্টিভিটি থাকে, যেখানে গুণী মানুষেরা তাঁদের জীবনের সংগ্রামের গল্প শোনান। রুমের মধ্যে একা বসে থাকলে মন খারাপ আরও বাড়বে। তাই রুমে একা না থেকে সবার সঙ্গে মিশে এই প্রোগ্রামগুলোতে জয়েন করলে অনেক কিছু জানাও যায়, আবার সময়টাও খুব সুন্দরভাবে কেটে যায়। এটিই মনোবল ধরে রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়।
অনেক ধন্যবাদ দীপা। আপনি ভালো থাকুন, আপনার স্বপ্নগুলো সত্যি হোক। বাকি সময়টুকু আরও সাফল্যের সঙ্গে পার করে চমৎকার ফলাফল নিয়ে বের হন, এটাই কামনা করি। আপনার ও আপনার পরিবারের জন্য আমাদের অবিরাম শুভকামনা।
দীপা সিং: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ আপু।