সাক্ষাৎকার

মনের জট খুলুন, মানসিক চাপ কমানোর কৌশল

প্রথম আলো ট্রাস্টের একটি আয়োজন বিনা মূল্যে মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভা। এ আয়োজনের আওতায় গত ১৬ মার্চ ২০২৬ প্রথম আলোর কার্যালয় কারওয়ান বাজারে ১৭৬তম অনলাইন পরামর্শ সহায়তা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত থেকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. ফারজানা রহমান পরামর্শ প্রদান করেন। এইবারের বিষয়টি ছিল —' মনের জট খুলুন, মানসিক চাপ কমানোর কৌশল।' অনুষ্ঠানটি সাক্ষাৎকার আকারে তুলে ধরা হলো।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

কিন্তু অনেক সময় কারো আচরণে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কষ্ট থেকে মনে জট পাকিয়ে যায়। আপনি যখন 'মিটাইম' বা ভালো স্মৃতির কথা বলছেন, তখন কি উল্টো সেই খারাপ স্মৃতিগুলোই বেশি মনে পড়বে না? এই চর্চাটা আমরা কীভাবে করতে পারি?

ডা.ফারজানা রহমান: বর্তমানে একটি নতুন স্লোগান খুব কার্যকর হচ্ছে—তা হলো 'তাকে এটা করতে দাও'। এর মানে পরাজয় স্বীকার করা বা প্রশ্রয় দেওয়া নয়। এটি হলো পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা। আমি যখন ভাবি 'ওকে এটা করতে দাও', তখন আমার মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারে পরিবর্তন আসে। আমি নির্ধারণ করে দিই যে আমি তাকে কতটুকু বাড়তে দেব।

এটি কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং নিজেকে প্রস্তুত করা। যখন পরিস্থিতি সহ্যের বাইরে চলে যাবে, তখন সুন্দরভাবে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে তাকে বোঝাতে হবে যে তার আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। গলার স্বর নিচু রেখে শান্তভাবে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলতে হবে বা নিজের কষ্টের কথা সরাসরি জানাতে হবে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

এখনকার প্রজন্মের সন্তানদের মনোযোগের স্থায়িত্ব কম হলেও তারা মনের ব্যাপারে বেশ সচেতন। তাদের কাছে এই মানসিক চাপের বিষয়টি কীভাবে উপস্থাপন করা যায়?

ডা.ফারজানা রহমান: আমি একটি উদাহরণের মাধ্যমে এটি ব্যাখ্যা করি। পানিতে চিনি দিলে পানি মিষ্টি হয়। এখানে মিষ্টি ভাবটা পানির নয়, চিনির গুণ। তেমনি মনে যখন ক্রমাগত জট বা চাপ তৈরি হয়, তখন আমাদের মস্তিষ্কের রাসায়নিক উপাদান বা নিউরোট্রান্সমিটার—যেমন ডোপামিন, সিরোটোনিন, এপিনেপ্রিন ও নর-এপিনেপ্রিন-এর ভারসাম্য নষ্ট হয়।

যখন এই ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তখন মানুষ ইতিবাচক কিছু গ্রহণ করার বা ভালোবাসা বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এই ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার প্রথম ধাপ হলো কথা বলা। নিজের বিশ্বস্ত বন্ধু, অভিভাবক বা প্রিয়জনের কাছে মনের কষ্টগুলো প্রকাশ করলে এই রাসায়নিক ভারসাম্য আবার ফিরতে শুরু করে।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

অনেক সময় আমরা নিজেদের প্রকাশ করতে না পেরে চারদিকে দেয়াল তৈরি করে ফেলি। এই একাকীত্ব থেকে মাদক বা ডিভাইসে আসক্তি তৈরি হতে পারে। এখান থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

ডা.ফারজানা রহমান: প্রথমত নিজের ইচ্ছা বা মোটিভেশন খুব জরুরি। বিজ্ঞান এখন বলে 'আমি আমি' তত্ত্ব থেকে বের হয়ে অন্যকে সাহায্য করার মানসিকতা আমাদের ভালো রাখতে সাহায্য করে। নিজেকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করা এবং ইতিবাচক মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন।

তবে মনে রাখতে হবে, ভালোবাসার মানে এই নয় যে সব অন্যায় ক্ষমা করে দিতে হবে। সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় বলার ক্ষমতা থাকতে হবে। যদি কারো আচরণে হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়, তবে সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে আনার মানসিকতাও রাখতে হবে। পুরোটাই নিজের মানসিক প্রশান্তির জন্য।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

যদি কেউ নিজে বুঝতে না পারে যে সে আসক্ত হয়ে গেছে, তবে পরিবারের সদস্যরা কীভাবে সাহায্য করতে পারেন?

ডা.ফারজানা রহমান: পরিবারকে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বই পড়া বা বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে। পরিবারের মূল্যবোধ জাগ্রত করা জরুরি। তাকে এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে—"হয়তো তোমার আচরণে আমরা কষ্ট পাচ্ছি, কিন্তু তবুও আমরা তোমার পাশে আছি।" এই আশ্বাসটুকু পেলে অনেক মনের জট অনায়াসেই খুলে যায়।

প্রথম আলো ট্রাস্ট:

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আজ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।

আপনাদেরও ধন্যবাদ।