মেঘনাপাড় থেকে ঢাকার রাজপথ: সজিবের এগিয়ে যাওয়ার লড়াই

মেঘনাপাড় ধীবর আলোর পাঠশালার সাবেক শিক্ষার্থী মো. সজিব ব্যাপারী।

লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার মেঘনা নদীর তীরের শান্ত জনপদ থেকে উঠে আসা এক লড়াকু তরুণের নাম মো. সজিব ব্যাপারী। যার শৈশব কেটেছে অভাবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, আর এখন তার তারুণ্য কাটছে কায়িক শ্রম ও পড়াশোনার কঠিন এক মিশেলে। সজিবের এই পথচলা কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং এক বুক আশা আর দায়িত্ববোধের গল্প।

দরিদ্র কৃষক করিম আলী ব্যাপারীর সেজো ছেলে সজিব। নিজস্ব কোনো জমি বা বসতভিটা নেই তাদের; অন্যের ভিটায় বসবাস আর বর্গাচাষ করেই চলত সজিবদের সংসার। ছোটবেলা থেকেই বাবার এই হাড়ভাঙা খাটুনি দেখে বড় হওয়া সজিব পড়াশোনার পাশাপাশি মাঠেও কাজ করেছেন নিয়মিত।

সজিবের শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছিল মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যানিকেতন’থেকে (বর্তমানে মেঘনাপাড় ধীবর আলোর পাঠশালা, যা প্রথম আলো ট্রাস্ট কর্তৃক পরিচালিত)। পরে ডা. আব্দুল হক আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে সে এখন রাজধানীর পল্লবী সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। তবে ঢাকার এই ঝলমলে শহরে তার জীবনটা আর দশটা সাধারণ শিক্ষার্থীর মতো নয়। পড়াশোনার ফাঁকে সে কাজ করে ‘সেরা-বাজার ডট কম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে। প্রতিদিন ভারী পণ্যের প্যাকেট করার সময় সজিবের হাতের তালুতে ঘাম জমে, ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসে, কিন্তু পরিবারের কথা ভেবে সে থামে না।

আজকের যুগে যখন সবাই বিত্ত আর ক্ষমতার পেছনে ছুটছে, তখন সজিবের স্বপ্নটা বেশ সাদামাটা কিন্তু গভীর। তার শিক্ষক শরীফুল ইসলাম যখন তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চেয়েছিলেন, সজিব উত্তর দিয়েছিল, 'স্যার, আমার বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন নেই। আমি শুধু একজন ভালো মানুষ হতে চাই। আর পরিবারটাকে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতে চাই।'

সজিব অট্টালিকার স্বপ্ন দেখে না, সে স্বপ্ন দেখে বাবা-মায়ের মুখে এক চিলতে হাসির। তার এই অকৃত্রিম সারল্য আর মানুষের মতো মানুষ হওয়ার প্রত্যয় তাকে সহপাঠীদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে যখন সে হোস্টেলের বই খোলে, তখন তার প্রেরণা হয়ে কাজ করে মেঘনাপাড়ের সেই শিক্ষকদের স্মৃতি।

ঢাকার রাজপথে ঘাম ঝরিয়ে নিজের স্বপ্ন বোনা এই তরুণ এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা। সজিবের মতো এমন মানবিকতা আর দায়িত্ববোধের চর্চাই তো এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ।