দেশের সেবায় নিয়োজিত আলোর পাঠশালার এক শিক্ষার্থী

প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালা।

প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালার সাবেক শিক্ষার্থী মশিউর রহমান। তিনি ২০১৭ সালে গুড়িহারী শালবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন। তারপর ২০১৮ সালে গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই ২০২৩ সালে মানবিক শাখায় এসএসসি পাস করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে কর্মরত।

বড় পরিবারের ছোট ছেলে মশিউর। তারা আট ভাই দুই বোন। ভাইবোনদের মধ্যে সে ছোট। তাঁর বাবা মকবুল হোসেন চায়ের দোকান করে সংসার চালান। মা মোরশেদা বেগম গৃহিণী। মোট ১৫ জনের পরিবারের খাদ্য বস্ত্র জোগাতে তাঁর বাবাকে হিমশিম খেতে হয়। এদিকে গুড়িহারী গ্রামে ৪ থেকে ৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। পঞ্চম শ্রেণি পাস করে দূরের স্কুলে টাকা খরচ করে লেখাপড়া করানোর মত সামর্থ্য মশিউরের বাবার নেই। এই অবস্থায় ভরসার জায়গা তৈরি করে নিয়েছে প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালা। অসহায় ও হত দরিদ্র মানুষের স্বপ্ন পূরণের দিশারি হিসেবে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয় গুড়িহারী গ্রামে। যার ফলে মশিউরসহ দরিদ্র ছাত্রদের সামনের ভবিষ্যত আলোকিত হয়। স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলেই মশিউরের মতো অনেকেই এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছে।

অভাবের কারণে মশিউর এক সময় পড়ালেখা বাদ দেওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ওই সময় আলোর পাঠশালার শিক্ষকেরা মশিউরের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাবা মাকে বুঝিয়ে পুনরায় স্কুল স্কুলমুখী করে। তারপর থেকে মশিউর নিয়মিত স্কুলে আসতেন এবং স্যারদের কথা মতো লেখাপড়ার পাশাপাশি ছুটির দিনে কাজ করতেন। এর মধ্যে মশিউর এসএসসি পাস করেন। তারপর সে সৈনিক পদে নিয়োগের আবেদন করেন এবং চূড়ান্তভাবে সৈনিক হওয়ার সুযোগ লাভ করেন।

মসিউর রহমানের বাবা বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। তার মধ্যে আমার আট ছেলে দুই মেয়ে। এদের মুখে ভাত কাপড় ঠিকমতো দিতে পারিনি। টাকা খরচ লেখাপড়ার করাতে হলে আমি পারতাম না আমার ছেলেকে পড়াতে। আমার বড় ছয়জন ছেলেকে আমি পড়াতে পারিনি টাকার জন্য। তবে মো. মাসুদ রানা, আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ সহ প্রথম আলো ট্রাস্ট এই স্কুল তৈরি করে না দিলে আমার এই ছেলেকে মেট্রিক পাস করাতে পারতাম না। আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমাদের গ্রামের ছেলে মাসুদ রানাসহ প্রথম আলো ট্রাস্টের সকলের প্রতি।'

মশিউর রহমান দীর্ঘ ৯ মাস প্রশিক্ষণ শেষে (৯ ফেব্রুয়ারি-১৪ অক্টোবর ২০২৫) অক্টোবরের ১৬ তারিখ ইউনিটে যোগদান করেন। গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালার শিক্ষার্থী মশিউরের আজ নিজস্ব একটা পরিচয় তৈরি করতে পেরেছেন।

গুড়িহারী গ্রামের ইউপি সদস্য মো. মোরশেদুল আলম বলেন, 'মকবুল চাচা গরিব মানুষ, চা বেঁচে সংসার চালাত। তাঁর তো সন্তান অনেক। অভাবের কারণে দশ ছেলে মেয়ের নয়জনই লেখাপড়া করতে পারেনি কিন্তু প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালায় পড়ার সুযোগ পেয়ে মকবুল চাচার ছোট ছেলে মশিউর রহমান এসএসসি পাস করেই সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়েছে। গ্রামে আলোর পাঠশালা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেই আজ দরিদ্র পরিবারের ছেলে মেয়ে লেখাপড়া শিখে কাজে লাগতে পারছে।’

গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালার প্রধান শিক্ষক রাজিত দাস বলেন, 'মশিউর অসম্ভব বিনয়ী একজন ছেলে। গ্রামের সকলেই বলতেন একদিনে ছেলেটা বাবা-মার মুখ উজ্জ্বল করবে। আজকে সেই দিনটি এসেছে। আমরা সকলেই তাঁর জন্য গর্বিত। আলোর পাঠশালার পক্ষ থেকে তাকে অভিনন্দন ও শুভকামনা জানাই। সে যেন সততার সঙ্গে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যেতে পারে।'