আলোর পাঠশালার সাইকেল যেন অনিকের পড়ালেখার নতুন দিশারী

গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র অনিক মুন্ডা।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে ২০২৬ সালে ভর্তি হওয়া অনিকের বাড়ি নিমদীঘি গ্রামে। বাবা নিরিপদ মুন্ডা পেশায় একজন ভ্যানচালক এবং মা অনিতা রানী একজন গৃহিণী। নিজের কোনো জমিজমা না থাকায় সংসারের চাকা সচল রাখতে অনিকের মাকেও অন্যের জমিতে শ্রম দিতে হয়। ভ্যান চালিয়ে বাবার যা আয় হয়, তা দিয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা। এই পরিস্থিতিতে অনিকের পড়াশোনার খরচ চালানোই যেখানে এক দুঃসাধ্য ব্যাপার, সেখানে যাতায়াতের জন্য একটি সাইকেল কেনা ছিল তাদের কাছে কেবলই এক অলীক স্বপ্ন।

অনিকের বাড়ি থেকে তার স্কুল প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করতে তাকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হতো। অনিক জানায়, সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় কখনো গাড়ি পাওয়া যেত, কখনো যেত না। আবার অনেক সময় পকেটে ভাড়া দেওয়ার মতো টাকাও থাকত না। নিরুপায় হয়ে তীব্র রোদ কিংবা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পায়ে হেঁটে ৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হতো তাকে। দীর্ঘ পথ হেঁটে যাওয়ার কারণে সে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ত যে, ক্লাসের পড়ালেখায় কোনোভাবেই মন বসাতে পারত না। এই নিয়ে সবসময় তার মনে এক গভীর হতাশা কাজ করত।

অনিকের এই কষ্টের দিন ফুরিয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যালয় থেকে অনিককে একটি নতুন সাইকেল উপহার দেওয়া হয়েছে। ঢাকার কিছু সহৃদয় ও মহান ব্যক্তি অসহায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য গুড়িহারী-কামদেবপুর আলোর পাঠশালায় ২৮টি সাইকেল প্রদান করেন। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বাছাই করে এই সাইকেলগুলো অনিকের মতো সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সাইকেল পাওয়ার পর অনিক ও তার পরিবার এখন ভীষণ আনন্দিত। অনিক জানায়— ' সাইকেল পেয়ে আমি এখন একদম সঠিক সময়ে স্কুলে আসতে পারছি। পড়াশোনাতেও আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দিতে পারছি। এই সাইকেলটি আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য এক নতুন সুযোগ তৈরি করে দিল।'

অনিকের বাবা নিরিপদ মুন্ডা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আমার ছেলে সাইকেল পাওয়ায় আমি ও আমার পরিবার অনেক খুশি। এখন সে প্রতিদিন নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে এবং পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ অনেক বেড়েছে। স্কুলে যাওয়ার জন্য এখন আর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। নিমদীঘি গ্রামের বাসিন্দা মো. বাবুল ইসলাম স্কুলের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, এর আগে কখনো কোনো স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের এভাবে সাইকেল দিতে দেখিনি। প্রথম আলো স্কুল (আলোর পাঠশালা) হওয়ার পরই আমরা এটা দেখতে পেলাম। ছুটির পর যখন সব শিক্ষার্থীরা একসাথে দল বেঁধে আনন্দ করতে করতে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরে, তখন দেখতে দারুণ লাগে। এখন অনিকের মতো আরও অনেক শিক্ষার্থীর যাতায়াতের কষ্ট দূর হয়েছে। দল বেঁধে সাইকেল চালিয়ে তাদের এই স্কুলে যাওয়া কেবল যাতায়াতই সহজ করেনি, বরং তাদের শিক্ষার পথকে করেছে আরও মসৃণ ও আনন্দময়।