প্রত্যন্ত চরে জ্বলছে শিক্ষার আলো, ডানা মেলছে বড় হওয়ার স্বপ্ন

কুড়িগ্রামের প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত ‘প্রথম আলো চর আলোর পাঠশালা’।

নদীভাঙন কবলিত চরের মানুষের জীবন মানেই সংগ্রাম। একসময় যেখানে তিনবেলা খাবার জোগাড় করাই ছিল মুখ্য, শিক্ষা ছিল সেখানে আকাশকুসুম ব্যাপার। এখানে আজ শিক্ষার মশাল জ্বালিয়েছে প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত আলোর পাঠশালা। প্রত্যন্ত কুড়িগ্রামের ‘প্রথম আলো চর’-এ ২০০৫ সালে গড়ে ওঠা ‘প্রথম আলো চর আলোর পাঠশালা’ সেই আলোর দিশারি।

একসময় প্রথম আলো চরের মানুষ শিক্ষার গুরুত্বই বুঝত না। দারিদ্র্য, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব, বন্যা-ভাঙনে স্কুল পর্যন্ত যাওয়া ছিল দুঃস্বপ্ন। শিশুরা মাছ ধরা, গরু-ছাগল চরানো আর বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজেই ব্যস্ত থাকত। ফলে চরজুড়ে ছিল নিরক্ষরতার ঘন অন্ধকার।

সেই অন্ধকার ঘোচাতেই সাংবাদিক সফি খানের উদ্যোগে প্রথম আলো ট্রাস্টের সহযোগিতায় ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘প্রথম আলো চর আলোর পাঠশালা’। এই নামের মধ্যেই যেন শপথ-চরের বুকে আলো জ্বালানো।

প্রতিকূলতার পাহাড় পেরিয়ে আজ এখানে। শুরুর দিনগুলো মোটেই সহজ ছিল না। টিনের বেড়া আর ছনের ছাউনিতে পাঠদান শুরু হয়। বর্ষায় পানি, শীতে কনকনে বাতাস ছিল নিত্যসঙ্গী। ‘মেয়ে পড়াশোনা করে কী করবে, ছেলে মাঠে কাজ না করলে সংসার চলবে কীভাবে’—অভিভাবকদের কাছ থেকে এমন কথা শুনতে হয়েছে বারবার। কিন্তু আলোর পাঠশালার শিক্ষকেরা হাল ছাড়েননি। বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন, বুঝিয়েছেন। অভিভাবকদের নিয়ে উঠান বৈঠক করেছেন। ধীরে ধীরে বদলেছে চিত্র।

এখন প্রথম আলো চর আলোর পাঠশালায় ছেলেমেয়েরা শিক্ষার আলোতে আলোকিত হতে ছুটে আসছে। টিনের চালের নিচে বসেই তারা স্বপ্ন দেখছে ডাক্তার, শিক্ষক, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। অনেক শিক্ষার্থী এখন পার্শ্ববর্তী ও শহরের বিভিন্ন নামকরা কলেজে ভর্তি হয়ে আরও বড় স্বপ্নের পথে হাঁটছে।

পাঠশালার সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. আ. কাদের বলেন, ‘আগে বাচ্চা পাওয়া যেত না। এখন অভিভাবকরাই এসে বলে, স্যার আমার মেয়েটাকে ভর্তি করান। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

‘প্রথম আলো চর আলোর পাঠশালা’ প্রমাণ করেছে, ইচ্ছা থাকলে নদী, দারিদ্র্য আর অজ্ঞতাকেও জয় করা যায়। একটি পাঠশালা শুধু অক্ষরই শেখায় না, একটি প্রজন্মকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে। এভাবে চলতে থাকলে এই আলো একদিন পুরো চরকে আলোকিত করবে এটাই প্রথম আলো চর আলোর পাঠশালার প্রত্যাশা।