default-image

রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার অদম্য মেধাবী সত্যজিৎ শোনালেন তাঁর জীবনের গল্প। ছোট থেকে নানা প্রতিকূলতা দেখেছেন তিনি। সাহস নিয়ে প্রতিকূলতা অতিক্রম করেছেন এবং সফলও হয়েছেন। তাঁর জীবনের নানা গল্প উঠে আসে ৯ জানুয়ারি ২০২১ প্রথম আলো ট্রাস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘অদম্য মেধাবীর সঙ্গে’ অনলাইন অনুষ্ঠানে। তিনি ‘ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবী’ শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।

বেড়ে ওঠার গল্পটা বলতে গিয়ে সত্যজিৎ বলেন, ‘বাবা মুড়ির ব্যবসা করতেন। মা গৃহিণী ছিলেন। মুড়ি বিক্রির আয়ে সংসার চালানো কঠিন ছিল। এর মধ্যে তিন ভাইয়ের পড়াশোনা। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসে প্রথম ছিলাম আমি। এই ভালো ফল করার পেছনে ছিল বাবার কঠোর পরিশ্রম, শিক্ষকদের সাহায্য-সহযোগিতা ও আমার অধ্যাবসায়। বাবা নিরক্ষর হওয়ার পরও আমাদের পড়াশোনার প্রতি তিনি সজাগ ছিলেন, সব সময় খোঁজ রাখতেন। তাঁর পরিশ্রম ও আগ্রহ আমাকে সব সময়ে ভাবাত। অবশ্যই ভালো কিছু করতে হবে, ঘামের মূল্য দিতে হবে।’

তাঁর ভাষ্য় মতে, প্রতিদিন বাড়ি থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে স্কুলে যেতে হয়েছে। স্কুলের শিক্ষকেরা সার্বিক সহায়তা করেছেন। প্রাইভেটের টাকা নিতেন না। এই সহানুভূতিগুলো আমাকে তাড়িত করত এভাবে যে, আমাকে ভালো করতেই হবে। পড়াশোনা করতাম। এভাবে প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষায় ফল ভালো হলো। কিন্তু ফরম পূরণের অর্থ ছিল না। এখানেও শিক্ষকেরা এগিয়ে এলেন। সবার সহযোগিতার প্রতিদান দিতে হলে ভালো ফল করতে হবে এটাই মাথায় কাজ করত। আমার স্কুল থেকে দুইজন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম হয়েছিলাম আমি।

বিজ্ঞাপন
default-image

সত্যজিৎ বলেন, ‘ভালো ফলাফলে সবাই খুশি হলেও আমি ও আমার পরিবার খুশি হতে পারেনি। কারণ, ভালো কলেজে ভর্তির বিষয় অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ঠিক তখন (২০১০ সাল) প্রথম আলোয় আমাকে নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়। পরে ‘ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবী’ শিক্ষাবৃত্তির জন্য মনোনীত হই। তখন মনে হলো, আমার স্বপ্নটা পূরণ হতে যাচ্ছে। সত্যি কথা বলতে, বৃত্তিটা আমার জীবনের মোড় ঘুড়িয়ে দেয়। আমার পরিবার বিশেষ করে আমার বাবা খুব খুশি হন।’

শিক্ষাবৃত্তির সহায়তা নিয়ে সত্যজিৎ উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করেন এবং এখানেও জিপিএ-৫ পেয়ে সফলতা ধরে রাখেন । পুনরায় নির্বাচিত হন ‘ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবী’ উচ্চশিক্ষা বৃত্তি প্রকল্পের জন্য। পরবর্তীতে আর দুশ্চিন্তা করতে হয়নি তাঁকে। ভালোভাবে পড়াশোনা করে ভর্তির সুযোগ অর্জন করেন রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে। সেখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে বর্তমানে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অধীন ইজিআইএমএনএস প্রকল্পের সহকারী পরিচালক (অপারেশন) পদে কর্মরত আছেন। লক্ষ্য তার আরও ভালো কিছু করার। সে জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন বলে জানান সত্যজিৎ।

সকল অদম্যদের জন্য কোনো পরামর্শ আছে কি না জানতে চাইলে সত্যজিৎ বলেন, ‘আমরা যারা অদম্য মেধাবী প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসচ্ছল পরিবার থেকে উঠে আসি তাদের অসামান্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। বাবা-মাও অনেক ত্যাগ স্বীকার করেন। সে জন্য আমার ছোটদের বলব, মা-বাবার পরিশ্রমটুকু অনুভব করেন, তাহলে কোনো মোটিভেশন লাগবে না। কোনো বাধাই আর বাধা হতে পারবে না।’

মা-বাবা কি বলেন সত্যজিৎকে দেখে? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘মা- বাবা অনেক খুশি এবং ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্টের প্রতি কৃতজ্ঞ। নিজের আয় করা টাকা দিয়ে যখন মা-বাবার জন্য কিছু কেনাকাটা করি তখন স্বর্গীয় আনন্দ হয়, যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। গত দুর্গাপূজায় মা-বাবা ও পরিবারের লোকজনের জন্য কাপড় কিনেছিলাম। তাঁরা খুব খুশি হয়েছেন। এসব কিছুর জন্য ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্টকে ধন্যবাদ জানাই। আমি যেন আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারি সে জন্য আশীর্বাদ করবেন।’

অনুষ্ঠানটি একযোগে প্রচার করা হয় প্রথম আলোর ইউটিউব চ্যানেল, প্রথম আলোর ফেসবুক, প্রথম আলো এবং প্রথম আলো ট্রাস্টের ফেসবুক থেকে। সঞ্চালনায় ছিলেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা।

মন্তব্য করুন