কিশোরী মেয়েটার কাছে পৃথিবীটা সবে সুন্দর হয়ে উঠছিল। চঞ্চল চোখ দুটোয় এসে জড়ো হচ্ছিল জীবনের বিস্ময়। এমন সময় অভিভাবকরা ধরেবেঁধে মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দেন। কিশোরীবধূ কাঁদতে কাঁদতে স্বামীর ঘরে যায়। ঘটনাচক্রে একদিন স্বামীরূপী অমানুষটা তার মুখে এসিড মেরে দেয়। মেয়েটার মুখের ডান পাশটা জ্বলে-পুড়ে-কুঁকড়ে যায়। একটা চোখ ঝলসে যায়। একটা কান গলে মিশে অর্ধেক হয়ে যায়। সুন্দর পৃথিবীটা সুন্দরই থেকে যায়, কিন্তু একটা মেয়ের সব সৌন্দর্য এক নিমেষে ছারখার হয়ে যায়। মেয়েটার নাম শামীমা আক্তার। বয়স ২৫ বছর। যখন বিয়ে হয়, তখন বয়স ছিল মাত্র ১৫। বিয়ের ১১ মাসের মাথায় স্বামী তাকে এসিডে ঝলসে দেয়। দীর্ঘদিন জড়পদার্থের মতো পড়ে থাকেন শামীমা। জীবনের সবটুকু আলো নিভে যায় তার। কিন্তু শামীমা দমবার নন। তার ভেতরে আছে আগুনের ফুল। বাইরের সৌন্দর্য হারিয়ে যেন জেগে ওঠে তার অন্তরের সুন্দর। জীবনের গভীর থেকে শুনতে পান মানবতার সুর। তার মতো দুঃখিনী মেয়েদের জড়ো করে গড়ে তোলেন সমিতি। মিলেমিশে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার সাধনায় ব্রতী হন তিনি। প্রথম আলোর ঝিনাইদহ প্রতিনিধি আজাদ রহমানের মুখে এমন গল্প শুনে শামীমাকে দেখার জন্য গত ২৭ এপ্রিল দুপুরে আমরা চললাম ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে। ‘ঐক্য নারী কল্যাণ সংস্থা’ সাইনবোর্ড লাগানো একটা আধাপাকা ঘরের সামনে মোটরসাইকেল থামিয়ে আজাদ রহমান বললেন, এটাই শামীমাদের বাড়ি। একটা ঘরকে টিনের বেড়া দিয়ে দু ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগে একটা চৌকি পাতা। আরেক ভাগে একটা বড় টেবিল রাখা। এ ঘর দুটো আসলে শামীমার সমিতি এবং বুটিকস ও সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তাদের বসবাসের বাড়ি একটু পাশে। ১৯৯৬ সালে এসিডদগ্ধ হওয়ার পর অনেক সময় চলে যায় চিকিত্সা ও মনের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে। তারপর কিছু একটা করার চেষ্টায় শামীমা খুঁজে নেন হাতের কাজ। যখন যেখানে প্রশিক্ষণের খোঁজ পান, ছুটে যান শিখতে। একদিন স্থানীয় মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘ঐক্য নারী কল্যাণ সংস্থা’। ৪৩ জন নারী সদস্য আছেন এ সমিতিতে। শামীমা সভানেত্রী। সদস্যদের নিজ হাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলে তারপর কাজ ধরিয়ে দেন তিনি। নিজেই ডিজাইন করেন। মেয়েদের থ্রি-পিস, শাড়ি, ছেলেদের ফতুয়ায় বাটিকস, ব্লক প্রিন্ট, ব্রাশ প্রিন্ট ও হাতের কাজ করে সেগুলো বিক্রি করেন। অনেক পার্টি আবার অর্ডারও দেয়। এই ঘরেই শামীমা শুরু করেছেন তার দ্বিতীয় মানবকল্যাণ— প্রতিবন্ধী মেয়েদের স্বাবলম্বী করে তোলার কাজ। গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের নিয়ে এসে হাতের কাজ শেখাচ্ছেন তিনি। ‘কেমন করে মনে এল এমন মহত্ ইচ্ছা?’ কিছু মানুষ আছেন, যারা না হেসে কথা বলতে পারেন না। শামীমা ঠিক তাদের মতো। মুখে হাসি ফুটিয়ে শামীমা বললেন, ‘একদিন এক মহিলা ভিক্ষা করতে আসেন। অসহায় মানুষ দেখলেই কেন যেন আমার গল্প করতে ইচ্ছা করে। গল্পে গল্পে জানতে পারলাম, বৃদ্ধার একমাত্র ছেলেটা মানসিক প্রতিবন্ধী আর মেয়েটা শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাদের কষ্টের সীমা নাই। বৃদ্ধার কাছ থেকে ঠিকানা রেখে একদিন তাদের বাড়িতে গেলাম দেখতে, পাশেই মরুটিয়া গ্রামে। বৃদ্ধার মেয়ের নাম ফেলি। বয়স ২৮ বছর। তার দুটো পা অচল। শামীমা বলেন, ‘ফেলিকে দেখে আমার মনে নতুন চিন্তা আসে— প্রতিবন্ধী মেয়েদের নিই না কেন আমার সমিতিতে? কায়দা-কৌশল শিখিয়ে দিলে ওরাও তো কাজ করে খেতে পারে! ফেলিকে বললাম, আমার সমিতিতে ভর্তি হবেন? সেলাই শেখাব। হাতের কাজ শেখাব। আয়-রোজগারও কিছু হবে। শুনে মহিলার সে কী উত্সাহ! সঙ্গে সঙ্গে চলে আসেন আমার হাত ধরে। আরো তিনজন প্রতিবন্ধী মেয়ের সন্ধান দেন তিনি। এদের একজন হলপাড়ার দুলি। বয়স ২৮-৩০ হবে। ট্রেন দুর্ঘটনায় তার ডান হাত ও ডান পা কাটা পড়েছে। এক হাতে সেলাই করা সম্ভব না। তবু তিনি বলেছেন, আমার মেয়ে ফ্রেম ধরে থাকবে আর আমি সেলাই করব। আমাদের গ্রামেই আরো দুটো মেয়ে পেয়েছি। একদিন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, পাশের বাড়িতে ধমকাধমকির আওয়াজ শুনে ঢুকি। দেখি, মোমেনা নামের ১৯ বছরের একটা পঙ্গু মেয়েকে তার বাবা যা-তা বলে বকাবকি করছেন। মেয়েটাকে আমি নিয়ে আসি। এভাবে গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রতিবন্ধী মেয়েদের খোঁজ করছি। এ পর্যন্ত ২২ জন পেয়েছি। আরো পাব। ছেলে পেয়েছি তিনজন। ঠিক করেছি, এদের নিয়ে আলাদা সমিতি করব। আলাদাভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যাতে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।’ কথার মাঝেই শামীমার মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। ছোট ভাইটিকে ইশারা করে শামীমা বলেন, ঢাকার ফোন হলে দিবি। ঝিনাইদহের হলে দিবি না। ছোট ভাই ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সোহাগ কিছুক্ষণ কথা বলে এসে জানায়, ঝিনাইদহ থেকে ১০টা ফতুয়া ও ১০টা ওয়ালমেটের অর্ডার দিতে চায়। শামীমা বলেন, ‘না করে দে।’ কেন, জানতে চাইলে শামীমার সহজ জবাব, পুরুষ পার্টি। ওদের সঙ্গে আমি কাজ করব না। ‘কেন?’ শামীমার মুখে এখনো হাসি, তবে কিছুটা যেন তাচ্ছিল্যের, ঘৃণার। ‘পুরুষদের প্রতি ঘৃণা?’ শামীমা আবার ঠোঁটের কোণে মধুর হাসি ফিরিয়ে এনে সম্মতির মাথা নাড়েন। এবার জানতে চাই সেই ঘৃণার, সেই পুরুষবিদ্বেষের জন্মকথা। শামীমার বড় ভাই মফিজুল আলম স্বপন বলেন, সে ঘটনা সবাই জানে। এসিড মারার পর ওর স্বামী হাতেনাতে ধরা পড়ে। বিচার হয়। ৪৫ বছরের কারাদণ্ড হয় তার। এখন জেলে আছে। ‘কিন্তু এসিড মারল কেন?’ ‘যৌতুক, নারী নির্যাতন ও এসিড-সন্ত্রাস— এই তিন ধারায় মামলা করেছিলাম আমরা’— বলে কাজে চলে গেলেন বড় ভাই। ‘আর কিছু? ঘটনার পেছনের কোনো ঘটনা?’ শামীমা খানিকক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর ‘এ কথা আমি আজ পর্যন্ত কাউকে বলিনি’ বলে ঘটনার পেছনের এমন এক ঘটনার কথা বললেন, যা শুনে আমাদের অভিভাবকদের অশিক্ষা ও অসচেতনতা যে একটা মেয়ের কত বড় সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে, তা আরেকবার বোঝা গেল। ঘটনাটা এ রকম : ১৯৯৫ সালে শামীমা অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। তারা পাঁচ বোন, দুই ভাই। চার বোনের বিয়ে হয়েছে। শামীমা ছোট। বড় এক বোন একদিন এক পাত্রের খোঁজ আনে— যশোরের আমিরুল ইসলাম। বয়স একটু বেশি— ৩৫ বছর। তাতে কী! শামীমা আপত্তি তোলে— এখনই বিয়ে হলে লেখাপড়ার কী হবে? কিন্তু কে শোনে সে কথা! ১৫ বছরের শামীমাকে ধরেবেঁধে গছিয়ে দেওয়া হয় ৩৫ বছরের পাত্রের কাছে। বাসররাতে স্বামীর আচমকা উগ্রমূর্তি আর আক্রমণাত্মক ভঙ্গি দেখে সে প্রচণ্ড ভয় পায়। তার চিত্কারে লোকজন ছুটে আসে। কিন্তু শামীমা আর ঘরে যায় না। সারা রাত বাইরে কাটিয়ে দেয়, সারা দিন পালিয়ে বেড়ায় স্বামীর খপ্পর থেকে। এভাবে তিন দিন পর কাঁদাকাটি করে বাবার বাড়ি চলে আসে। তবে কাউকে কিছু বলে না। কদিন পর বাবা-মা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আবার রেখে আসেন শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু শামীমার অবস্থা তথৈবচ— বাঘের থাবা থেকে যেন শিশু হরিণীর প্রাণপণ বাঁচার চেষ্টা। এভাবে কাটে এক সপ্তাহ। এবার শুরু হয় অপবাদের পালা। ‘বেয়াদব মেয়ে!’ ‘বেশি ঢঙ করে!’ ‘নাকি সম্পর্ক আছে অন্য কোথাও!’— কত রকম কথা! শেষ কথাটা মনে ধরে স্বামী আমিরুলের। হইচইয়ের মধ্যেই এসিড মারার হুমকি দেয় কে যেন! শামীমা কেঁদেকেটে একাকার করে আবার চলে আসে বাবার বাড়ি। অপবাদ আসে এখানেও। এবার শুরু হয় যৌতুক দাবি, অন্য মাত্রায় নির্যাতন। শামীমা বলেন, ‘এসিড মারার কথাটা আমি আমল দিইনি। ভেবেছি, এসিড আবার মারে কীভাবে? কিন্তু সত্যি সত্যি একদিন আমাকে এসিড মেরে বসল। ১৯৯৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের কথা। আমি বাবার বাড়িতে একা ঘরে ঘুমিয়ে ছিলাম। মাথার কাছে জানালাটা খোলা ছিল। রাত ২টার দিকে হঠাত্ আমার মুখে কী যেন পড়ল আর জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে লাগল। আমি চিত্কার-চেঁচামেচি করছি আর আমার মনে পড়ছে সেই এসিড মারার হুমকির কথা। ওই অবস্থায়ই আমি চেঁচিয়ে বললাম, তোমাদের জামাই আমার মুখে এসিড মেরেছে!’ বাসার সবাই বলে, ও এখানে এত রাতে আসবে কী করে? ‘আমি বলছি ও এসেছে। ও আমাকে এসিড মেরেছে। তোমরা খুঁজে দেখো। ওকে পাওয়া যাবেই।’ এবং সত্যি সত্যি খুঁজে পাওয়া গেল ওকে। শামীমার মায়াভরা একটা মাত্র চোখ কেমন যেন ভেজা ভেজা থাকে। গল্প শেষে তার চোখটা নতুন করে জলে ভরল কিনা, বোঝা গেল না। তবে তার মুখের সেই অনাবিল হাসিটা লেগেই রইল। আশ্চর্য! এমন হাসি কেমন করে হাসে মেয়েটা? কোত্থেকে আসে সেটা? কোন সুদূর থেকে কোন শুভ-সুন্দর-স্বর্গীয় অনুভব ভেসে এসে এমন মধুর হাসি মাখিয়ে দিয়ে যায় এসিডে পোড়া একটা মেয়ের মুখে— পৃথিবীর মানুষ কি তার খোঁজ রাখে? না রাখুক। শামীমার কোনো দুঃখ নেই। বাবা রওশন আলী বলেন, ‘এই মেয়েটার পিছে আমার সব শেষ। এ পর্যন্ত আশি হাজার টাকা খরচ হয়ে গেছে।’ মা রোকেয়া বেগম বলেন, ‘আমি এ বিয়েতে রাজি ছিলাম না। মেয়েরা জোর করে দিয়েছে।’ মেয়েরা আবার বলেন, কে জানতো এমন হবে? সবার কৈফিয়ত আছে, সান্ত্বনা আছে। শামীমার কিছু নেই। কাউকে কিছু বলারও নেই, কারো প্রতি কোনো ক্ষোভও নেই। তার এখন একটাই কাজ, একটাই সাধনা— তার মতো দুঃখের আগুনে পোড়া মেয়েদের মুখে হাসি ফোটানো আর নিজে একজন বড় পোশাক ডিজাইনার হওয়া। শামীমা পারবে না তার সাধনায় সফল হতে?

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0