default-image

২০ ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছে মেরিল-প্রথম আলো সাভার সহায়তা তহবিল।

রানা প্লাজার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন পারভিন বেগম। ভবন ধসের ১১ দিন পর তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়। তাঁর রেখে যাওয়া ছোট্ট পাপিয়া আক্তার এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে। বড় হয়ে সে চিকিৎসক হতে চায়। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। পাপিয়ার মতোই পড়াশোনা করে মাহবুবা রহমান, খাদিজা আক্তার ও তানজিলা আক্তার চিকিৎসক হতে চায়। বিকেএসপিতে ভর্তি হয়ে পাবনার নয়ন হোসেন ক্রিকেটার হতে চায়। তাদের কারও মা, কারও বাবা কিংবা মা-বাবা দুজনই রানা প্লাজা ধসে নিহত হয়েছেন।পাপিয়া, মাহবুবা, মিলি, তানজিলা, নয়নের মতো ২০ ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাচ্ছে মেরিল-প্রথম আলো সাভার সহায়তা তহবিল। প্রথম আলো ট্রাস্টের আয়োজনে ‘ঘুরে দাঁড়ানোর ছয় বছর’ শীর্ষক মতবিনিময় সম্মিলনে হাজির হয়ে তারা প্রত্যেকেই বলল পড়াশোনা করে কোথায় যেতে চায়।

default-image

গতকাল শনিবার ঢাকার কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন তহবিল থেকে সহায়তা পাওয়া ভবনধসে আহত ১০১ জনের মধ্যে ১০ জন। তাঁরা প্রত্যেকেই গত ছয় বছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। দুঃসহ স্মৃতি পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন।

অতিথি হিসেবে মতবিনিময়ে ছিলেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘যখন মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতার কথা আসে, তখন সবাই আবেগে আপ্লুত হন। প্রথমে কিছুদিন আবেগটা থাকে, সাহায্যের জন্য সবাই এগিয়ে আসে। কিন্তু সেই আবেগটা দীর্ঘদিন ধরে রাখার বিষয়টি আমরা খুব বেশি দেখি না।’ সুবিধাভোগীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রথম আলো কেবল একটি সংবাদপত্র বা একটি ওয়েবসাইট নয়, প্রথম আলো একটি আন্দোলন। আপনারা প্রত্যেকেই এই আন্দোলনের অংশ। আপনারা প্রতিজ্ঞা করেন যে ভালোর সঙ্গে আপনারা আছেন সেই ভালোকে আরও ছড়িয়ে দেবেন।’

তহবিলের শিক্ষাবৃত্তির আওতায় থাকা ২০ শিক্ষার্থী যাতে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করতে পারে, সেই সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রথম আলো যে কাজ করছে, তা অব্যাহত থাকবে। সমস্যা শেষ হয়ে গেলেও নিহত ও আহত শ্রমিক ভাইবোন এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে আমরা থাকব। তহবিলের ৫০ লাখ টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত আছে। সেখান থেকে যা আয় হবে, তা আপনাদের সন্তানদের জন্য ব্যয় হবে।’

আরও বক্তব্য দেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আব্দুল কাইয়ুম, সাজ্জাদ শরিফ, আনিসুল হক ও সুমনা শারমিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আজিজা আহমেদ।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের পর গঠিত মেরিল-প্রথম আলো সাভার সহায়তা তহবিলে ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা জমা পড়ে। তহবিলে অনেকে অর্থ দেন। তহবিল থেকে ৯৫ জন আহত শ্রমিক ও নিহতের পরিবার এবং ৫ উদ্ধারকর্মীকে ১ লাখ টাকা করে এবং একজন আহত শ্রমিককে চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়। ৭৬ লাখ টাকা উদ্ধারকাজের জন্য বিভিন্ন সরঞ্জাম, ত্রাণ, আহতদের চিকিৎসা ব্যয় ও সিআরপিকে অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়। ৫০ লাখ টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রেখে ২০ জন শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে।

default-image

শিক্ষাবৃত্তির আওতায় থাকা ২০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জনের বাবা রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় নিহত হয়েছেন। ৬ জনের মা মারা গেছেন। একজনের বাবা-মা উভয়ই মারা গেছেন। বাকি দুই শিক্ষার্থীর মা আহত হয়েছেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে রায়মা জাহান স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়ছে। সুমনা হক ও রেদোয়ান হোসাইন গত বছর এইচএসসি পাস করেছে। ইমাম হোসেন ডিপ্লোমা করছেন। শারমিন আক্তার, তানজিলা আক্তার ও হাসান মাহমুদ এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। মনিকা আক্তার ও মাহিয়া আক্তার দশম শ্রেণি; কামরুজ্জামান রোহান ও খাদিজা আক্তার নবম শ্রেণি; জান্নাতুল ফেরদৌস, মেহেদি হাসান ও মাহবুবা রহমান অষ্টম শ্রেণি; পাপিয়া আক্তার ও নয়ন হোসেন সপ্তম শ্রেণি, মৃদুল হোসেন ষষ্ঠ শ্রেণি, তানজির আহমেদ চতুর্থ, ফারজানা আক্তার তৃতীয় ও মারিয়া আক্তার দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।

মাহবুবা রহমানের মা মনোয়ারা বেগম রানা প্লাজার ফ্যান্টম অ্যাপারেলে কাজ করতেন। ভবনধসের ১৭ দিন পর তাঁর লাশ পাওয়া যায়। মাহবুবা এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। সে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকেই শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে আসছে। সে পড়ালেখা করে চিকিৎসক হতে চায়।

 রানা প্লাজা ধসে ডান হাত ও ডান পা ভেঙে গুরুতর আহত হয়েছিলেন পোশাকশ্রমিক খালিদ রেজা। চিকিৎসা করেও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেননি। ভবনধসের পর বিজিএমইএ থেকে দেওয়া মজুরি, ক্ষতিপূরণ ও সিআরপির অনুদান পান। মেরিল-প্রথম আলো সাভার সহায়তা তহবিল থেকে ১ লাখ টাকা অনুদান পান তিনি। সেই অর্থ দিয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রামপুরায় কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর দোকানের সংখ্যা ৩।

খালিদ রেজা বলেন, ‘প্রথম আলোর দেওয়া অনুদানে গত ছয় বছরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। বর্তমানে আর্থিকভাবে ভালো আছি।’

সূত্র: ৫ মে ২০১৯ প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0