মানুষ চাইলে পারে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে। আমিও পেরেছি। তাই ভয় পেলে হবে না। সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

তাসলিমার অদ্বিতীয়া হওয়ার গল্প জানতে চাইলে বলেন, ‘ছোটকালে অর্থনৈতিক চাপ বুঝতাম না। যখন ৫ম শ্রেণিতে উঠলাম, তখন গাইড বই কিনতে হয়, প্রাইভেট পড়তে হয়। এই সময় টাকার অভাবে এগুলো কিনতে পারতাম না। অনেক সমস্যায় পরতাম। পরে প্রাথমিক বৃত্তি পেয়ে পড়াশোনা চালিয়েছি। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পাই। এভাবে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে বাণিজ্য শাখা থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হই। পরে আমার স্কুলে শিক্ষক নিয়ে যান কলেজে ভর্তি করাতে। কলেজের শিক্ষকগণও অনেক সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের সৌজন্য কপি আমাকে দিয়ে দিতেন। পরে আমাকে নিয়ে একটা পত্রিকায় সংবাদ বের হয়। সেটা দেখে একজন আমাকে প্রতি মাসে এক হাজার করে টাকা দিত। এভাবে এইচএসসি পরীক্ষা দিই এবং জিপিএ-৫ পাই। এরপর আমি একা ময়মনসিংহে চলে আসি কোচিং করতে। মেস ঠিক করা, কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া-এসব নিজে নিজে করেছি। এমনকি নিজের খরচ চালানোর জন্য টিউশনিও করতে হয়েছে। এ কারণে প্রস্তুতি ভালোভাবে নিতে পারছিলাম না। একপর্যায়ে আমার এক আপুর মাধ্যমে এইউডব্লিউ’র ভর্তির বিজ্ঞাপন সম্পর্কে জানতে পারি। সবকিছু ভালোভাবে পড়ে আবেদন করি। ঢাকায় গিয়ে পরীক্ষা দেই। বৃত্তিসহ ভর্তির সুযোগ পাই।

এইউডব্লিউতে ভর্তির পর অনেক খুশি হলাম। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না, তাই বলে পড়াশোনা করতে পারব না-এটা মেনে নিতে পারছিলাম না। বাংলা মিডিয়ামে পড়াশোনা করছি। যখন এইউডব্লিউতে আসি তখন ১৭দেশের মেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগটা ছিল কঠিন। তা ছাড়া আমেরিকান শিক্ষক কি হোমওয়ার্ক দিচ্ছেন তা বুঝতে পারছিলাম না। তখন মনে হয়েছিল-আমি হয়তো পারব না। কিন্তু সিনিয়র আপুরা বলল, আমি যে বুঝতে পারছি না, এটা শিক্ষককে বলতে হবে। না পারাটা অপরাধ নয়। এটা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়। এ ক্ষেত্রে আমার শিক্ষকগণ ও এইউডব্লিউ অনেক সহযোগিতা করেছে। সবার সহযোগিতা নিয়ে এগোতে থাকি।’

শেষ সেমিস্টারে আমাদের একটা বইয়ের ওপর রিভিউ লিখতে হয়। আমি সেখানে ৯৭% নম্বর পাই। মানুষ চাইলে পারে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে। আমিও পেরেছি। তাই ভয় পেলে হবে না। সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, বললেন তাসলিমা।

default-image

এখন কি স্বপ্ন দেখেন জানাতে চাইলে তাসলিমা জানান, ‘আমি খুবই নিম্নবিত্ত পরিবারের বড় হয়েছি। সব সময় অভাব অনটন দেখেছি। আমার মনে হয়েছে- এই দারিদ্র্যতা কাটাতে হলে পড়াশোনা করতে হবে। আমি সেভাবেই পড়াশোনা করেছি। দরিদ্র অসহায় মানুষদের নিয়ে কাজ করতে চাই। আমি স্নাতকের ২য়বর্ষে পড়ি তখন থেকেই ঠিক করে রাখি যে, টিচ ফর বাংলাদেশ-এর ফেলো হব। কারণ, টিচ ফর বাংলাদেশ অসহায়, দরিদ্র শিশুদের পড়াশোনা নিয়ে কাজ করে। ঠিক তাই হলো। আমি স্নাতক শেষ করার তিন মাস আগেই টিচ ফর বাংলাদেশ-এ ফেলো হিসাবে জয়েন করলাম। এখানে কাজ করার সুবাদে জানতে পারলাম। সরকারি যেকোনো পজিশনে অনেক ক্ষমতা হোল্ড করে। তখন মনে হলো, আমাকে এটা করতে হলে সরকারের উচ্চপদস্থ কিছু হতে হবে। আমি সে লক্ষ্যেই বিসিএস দিচ্ছি এখন। আমার বিশ্বাস আমি পারব, আমার সেই সক্ষমতা আছে।

না পারাটা অপরাধ নয়। এটা খুবই স্বাভাবিক একটা বিষয়।
default-image

২০১২ সাল থেকে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এবং প্রথম আলো ফার্স্ট ফিমেল ইন দা ফ্যামিলি স্কলারশিপ অ্যাওয়ার্ড নামে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান শুরু করে। প্রতিবছর পরিবারের প্রথম নারী অথচ দরিদ্র, যিনি উচ্চতর শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজ গঠনে আগ্রহী, এ রকম ১০ জনকে ট্রান্সকম গ্রুপের সহায়তায় এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এ শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া শুরু করে। ট্রান্সকমের সহায়তায় ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৪২ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছেন। ২০১৭ সাল থেকে আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড এই শিক্ষাবৃত্তির দায়িত্ব নেয়। নামকরণ করা হয়েছে অদ্বিতীয়া। আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের সহায়তায় ৪৬ জনসহ এ পর্যন্ত মোট ৮৮ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছেন। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনও তাঁদের আবাসন, টিউশন ফি সুবিধাসহ নানা সুযোগ দেয়।

অনুষ্ঠানটি একযোগে সম্প্রচারিত হয় প্রথম আলোর ইউটিউব চ্যানেল, প্রথম আলোর ফেসবুক, প্রথম আলো এবং প্রথম আলো ট্রাস্টের ফেসবুক থেকে। সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা।

অদ্বিতীয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন