বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

স্কুলের ছাদে উঠলে পুরো চরটা দেখা যায়। চরের একদম মাঝখানে এই স্কুল। চারদিক থেকে ছেলেমেয়েরা স্কুলে আসে। চারপাশে জলা-ধানক্ষেত। দূরে গুচ্ছের মতো কিছু ঘর দেখা যায়। পুরো ইউনিয়নের প্রায় প্রতি বাড়িতেই স্কুলে পড়ার মতো ছেলে-মেয়ে আছে। সবাই হেঁটে হেঁটে, খেয়া পাড়ি দিয়ে স্কুলে আসে। যখন জোয়ারের পানি বেড়ে যায়, কেউ কেউ স্কুলে আসতে পারে না। যখন বৃষ্টি হয়, নদীতে স্রোত বাড়ে৷ স্কুলে আসে না কেউ কেউ। কারো বাড়িতে পানি উঠে গেলে, বাড়ি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। স্কুলে আসা হয় না। আর কোভিডে স্কুল পুরো বন্ধ ছিল। স্কুলে আসার প্রয়োজনই হয়নি।

মদনপুরে তিনটি প্রাইমারি স্কুল। আলোর পাঠশালা স্কুলটি চরের একমাত্র মাধ্যমিক স্কুল। প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত এই স্কুলে ছাত্রছাত্রী কোভিডের আগে ছিল ১৩৪ জন। কোভিডে প্রায় ৩৩ জন মেয়ে ঝড়ে গেছে। বিয়ে হয়ে গেছে তাদের। আর যারা আছে, তাদের মধ্যে স্কুলে আসার প্রবণতা কম। মাসে চারদিন স্কুল থাকলে, স্কুলে মনযোগ থাকে না বলে জানাল ছেলেমেয়েরা।

শিক্ষার্থীদের স্কুলে নিয়মিত আনার জন্য প্রথম আলো ট্রাস্ট কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কোভিডকালে শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। খাদ্যসামগ্রী দিয়েছে। কোভিডকালে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের এটি বেশ কাজে লেগেছে।

সাইক্লোন শেল্টারের দুই ফ্লোরজুড়ে স্কুল। ২০১৩-২০১৪ সালে স্কুল ভবনটি তৈরি করা হয়েছে। আগে এই চরে প্রাইমারি পাশ করে কেউ আর পড়তে পারতো না। এর উপরের শ্রেণিতে পড়ার জন্য চরের বাইরে চলে যেতে হত। এখন নবম-দশম শ্রেণির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এবারই প্রথম এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে এই স্কুলের পাঁচজন শিক্ষার্থী। স্কুলের একজন শিক্ষক চরে পরিবারসহ বাস করেন। অন্য পাঁচজন শিক্ষক থাকেন ভোলা সদরে।

প্রতিদিন মেঘনা নদীর পাড়ে খেয়ার সময় অনুযায়ী শিক্ষকেরা স্কুলে আসা যাওয়া করেন। যখন নদী উত্তাল থাকে, তাঁরা মনে শঙ্কা নিয়ে স্কুলে আসেন। ভাটার সময় ডুবোচরে নেমে যাওয়া লাগে।

গত বৃহস্পতিবার সকালে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যখন খেয়া ঘাটে আসি, তখন খেয়া চলে গেছে। আমাদের অপেক্ষা করতে হয় অনেকটা সময়। যখন খেয়া আসে, নদীতে তখন ভাটার টান। মেঘনা নদীর পানি দশহাত নেমে গেছে জোয়ারের তুলনায়। ঘাটের ধারেই প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা চর জেগে উঠেছে। সেখানে মহিষ চড়ছে।

খেয়া ছাড়ে। আকাশে অনেক রোদ। দেখি হেডস্যার আমাদের জন্য একটা স্পেয়ার ছাতা নিয়ে এসেছেন। আমরা নাকি অতিথি।

চর ঘুরে ট্রলার চলল আধঘন্টা। ওপারে যেতে যখন পাঁচশো মিটার বাকি, তখন দেখি মাঝে আরেকটা চর। বালুচর। ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল চালক। আমরা জুতা মোজা খুলে প্যান্ট গুটিয়ে নদীতে নেমে পড়লাম। হেঁটে চর পার হয়ে ওপাশের ট্রলারে উঠতে হল। ভাটার সময় এরকমই নাকি ব্যবস্থা। জোয়ারের সময় চরগুলো ডুবে যায়। বিকেল চারটায় যে খেয়া, সেটা জোয়ারের সময় এপার ওপারে যেতে পথে কোন চর পড়ে না। সরাসরি পার হওয়া যায়।

মেয়েদের পড়ার হার এই স্কুলে বেশি। ছেলেদের সংখ্যা খুবই কম। পরিবারের প্রয়োজনে ছেলেদের মাছ ধরার কাজ করতে হয়। স্কুলটা প্রান্তিক এলাকায়। গিয়ে দেখি, স্কুলের নিচের ফ্লোরে জেলেরা ব্যস্ত সময় পার করছে। জাল মেরামতে হাত চালিয়ে কাজ করছে। ২২ দিন নদীতে মাছ ধরা বন্ধ।

বাল্যবিবাহ বন্ধের জন্য এখানে স্কুলের শিক্ষকেরা খুব চেষ্টা করেন। মেয়েদের কাউন্সেলিং করেন। শিক্ষকেরা দলে ভাগ হয়ে বাড়িতে বাড়িতে যান। বাল্যবিবাহ বিষয়ে কথা বলেন। পরিবারকে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য বলেন। এলাকার চেয়ারম্যান যারা জন্মনিবন্ধন করে, তাদেরকে বলে দিয়েছেন, কোন অবস্থাতে বয়স কমানোর জন্মনিবন্ধন দেওয়া যাবে না। আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে তাও মেয়েদের বিয়ে দেওয়া চলছে। মেয়েরা ঝরে যাচ্ছে।

এলাকায় নারীরা কৃষি ও মহিষ লালন-পালন করেন। মেয়েরা নদীর মোহনায় ট্রলারে চেপে মাছ ধরতে যায় না। তাই স্কুলে মেয়ের সংখ্যা বেশি।

কোভিডকালে এই স্কুলের কোন ছেলেমেয়ে বাসায় পড়ার সুযোগ পায়নি। বাসায় পড়ার সুযোগ বা সাহায্য করার মতো মানুষ নেই। স্কুলে আসার পর শিক্ষকগণ আবার পড়ানো শুরু করেছেন। বাংলা বইয়ে তাদের একটা গল্প পড়া হয়েছে। সমাজ বইয়ের এক অধ্যায়। একটু গণিত একটু বিজ্ঞান পড়েছে তারা৷ মাসে চারদিন স্কুল থাকায় পড়াশোনায় কোন ক্রম থাকছে না।

এই স্কুলে বিজ্ঞান ও গণিত বিষয়কে সহজে পড়ানো ও উপকরণ ব্যবহার করে সহজে পাঠদান বিষয়ে একটি কর্মশালা করেছি। সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির আরেক স্বেচ্ছাসেবক সায়েম সরকার সিফাত। কর্মশালায় স্কুলের শিক্ষকেরা পর্যবেক্ষক হিসেবে ছিলেন। শিক্ষার্থীদের জন্য দুইটি নমুণা ক্লাস দেখানো হয়। যেখানে শিক্ষার্থীরা উপকরণ ব্যবহার করে একদিনের বিজ্ঞান ও গণিতের পাঠ শেখে।

উপকরণ ব্যবহার করে কীভাবে একটা বিজ্ঞান বা গণিত ক্লাস করা যায়, তার একটা পদ্ধতি বের করার চেষ্টা চলছে। ইএমকে সেন্টার, বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি আর প্রথম আলো ট্রাস্ট এই উদ্যোগের সাথে আছে। শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে কীভাবে শিক্ষার্থীর ক্ষতি কমিয়ে তাদেরকে পড়ার দিকে আনা যায়।

বিজ্ঞান ও গণিতের বাইরে অন্য বইগুলো শুধু রিডিং পড়লেই পড়া হয়ে যায়। গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে সুলভ উপকরণ ব্যবহার করে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক দেখিয়ে সহজে পাঠদান করার বাকি কাজটা শিক্ষকেরাই করবেন। স্কুল পুরোদমে খুলে দিলে, শিক্ষক ছেলেমেয়েদের নিয়ে কাজ এগিয়ে নিতে পারবেন নিশ্চয়ই।

ফেরার সময় স্যার জানালেন, মধুর চাক যখন কাটা হবে, আপনাদের ফোন করব। তখন আপনারা আবার আসবেন!

লেখক: বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির স্বেচ্ছাসেবক।

মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন