সে রাতে কোনো স্বপ্ন দেখেছিলাম কি না, আজ আর মনে নেই। শুধু ক্ষতের মতো বাস্তবের দুঃস্বপ্নটা ক্ষণে ক্ষণে জেগে ওঠে।
১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর। আর দশটা দিনের মতোই রাতে ঘুমিয়ে ছিলাম। রাতের অন্ধকারে জানালা দিয়ে গ্রামের কিছু সন্ত্রাসী এসে অ্যাসিড ছুড়ে মারে। অ্যাসিড এসে পড়ে আমার মুখে। আমার মুখমণ্ডলের একাংশ, গলা এবং ঘাড়ের একপাশ ঝলসে যায়।

default-image

ঝিনাইদহ সদরের টিকারী বাজারের বামনাইলে আমাদের বাড়ি। সেখান থেকেই সদর হাসপাতালে নেওয়া হয় আমাকে। ভর্তির করানোর পর আরও অসুস্থ হয়ে পড়ি। অবর্ণনীয় কষ্টে কাটে নয়টা দিন। এরপর ভারতে যাই চিকিৎসার জন্য। ছয় মাস চলে চিকিৎসা। শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ হই। কিন্তু মনের সুস্থতা ছিল? তখনো আমার চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। সে চিকিৎসাটা হয় ব্র্যাকের মাধ্যমে অ্যাসিড সারভাইভরস ফাউন্ডেশনে (এএসএফ)।
অনেক বছর চিকিৎসা চলেছিল। সেই দুর্দিনে পাশে দাঁড়িয়েছিল প্রথম আলো। পত্রিকাটির ঝিনাইদহ প্রতিনিধি আজাদ রহমানের সহযোগিতা পেয়েছি। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আমাকে একটি মুদির দোকান করে দেওয়া হয়। হাতে দেওয়া হয় নগদ তিন হাজার টাকা।
দোকান চালিয়ে যা আয় হতো, তাতেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। অ্যাসিড আক্রান্ত হওয়ার সময় আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়তাম। আবার আমি পড়াশোনা শুরু করি। কিন্তু তবুও দুঃসময় পিছু ছাড়ে না। কারণটা আমি অ্যাসিড–সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার তিন বছর আগের। ১৯৯৬ সালের কোনো একদিনের ঘটনা সেটা। রাতের অন্ধকারে আমার বাবা নারায়ণ চন্দ্র মণ্ডলকে গ্রামের কিছু সন্ত্রাসী কুপিয়ে রক্তাক্ত করে। সেই সন্ত্রাসী হামলায় বাবা বেঁচে গেলেও বরণ করে নিতে হয় পঙ্গুত্ব।
তাঁর পক্ষে আমাদের তিন ভাইবোনের পড়ালেখার খরচ দেওয়া অসম্ভবই ছিল। তখনো প্রথম আলো আমার পাশে দাঁড়ায়। বই কেনার অর্থ দেয়। আনুষঙ্গিক খরচের জন্য আমি টিউশনি শুরু করি। অনেক কষ্টে চলতে থাকে পড়াশোনা। এরপর ২০১৪ সালে জয়িতা পুরস্কার পাই। সেটিও ব্র্যাকের মাধ্যমে। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তি হলে প্রথম আলো আমাকে শিক্ষাবৃত্তি দেয়। এভাবে পড়াশোনা শেষ করি।
পড়াশোনা শেষে চাকরির সুযোগটাও পেয়ে গেলাম তিন মাস আগে। ব্র্যাকের মানবাধিকার ও আইন সহায়তা কর্মসূচির (এইচআরএলএস) একজন কর্মকর্তা হিসেবে মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলা ব্র্যাক অফিসে নির্যাতনের শিকার মানুষের অভিযোগ শুনি এবং সহায়তা করার চেষ্টা করি। এখন আমি খুব খুশি। আমার পরিবারও আনন্দিত।
তবে একটি সমস্যা রয়ে গেছে। এক ভাই, দুই বোনের মধ্যে আমি বড়। আমার বাবা শারীরিক প্রতিবন্ধী, মায়েরও অস্ত্রোপচার হয়েছে। ভাই এখনো ছোট। বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে কর্মস্থল অনেক দূরে। সিঙ্গাইর থেকে পরিবারের দেখাশোনা করা অনেক কষ্ট ও ব্যয়বহুল। মা–বাবাকে দেখার কেউ নেই। তাই আমার কর্মস্থল ঝিনাইদহ হলে আমি তাঁদের দেখাশোনা করতে পারতাম।
ব্র্যাকের মাধ্যমে আমার চিকিৎসা হয়। তাই ব্র্যাক আমার জীবন। প্রথম আলো আমার পড়ালেখা করার খরচ দিয়েছেন। তাই প্রথম আলো আমার শিক্ষা। আমি ব্র্যাক, প্রথম আলো এবং অ্যাসিড সারভাইভরস ফাউন্ডেশনের অবদানে মাথা তুলে বেঁচে আছি। আমি আজ নিজেকে নিয়ে অনেক গর্বিত।

রত্না মণ্ডল
ঝিনাইদহ।

সূত্র: ছুটির দিনে, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, প্রিন্ট সংস্করণ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0